‘এসো হে প্রভু নিরঞ্জন’।

নিরঞ্জন প্রভুকে সাঁইজী আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কে এই নিরঞ্জন? কেন তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে? কারণ,‘এ ভবতরঙ্গ দেখে আতঙ্কেতে যায় জনম’। ‘ভবতরঙ্গ’টা এইখানে ফ্যাক্টর। সাঁইজী বলছেন ‘ভবতরঙ্গ দেখে’। ভবতরঙ্গটাকে তিনি দেখছেন। ভারতীয় দর্শনের পদ্ধতি এটি। কোন একটা ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে দেখা। যেমন ‘করে দেখ না !’,‘বলে দেখ না !’,‘খেয়ে দেখ না !’। ‘করা’,‘বলা’, বা ‘খাওয়া’ এইগুলো একেকটা ক্রিয়াপদ। ‘দেখা’টাও তাই। কিন্তু শুধুমাত্র ‘দেখা’র মধ্যে দিয়ে সত্য ফসকে যেতে পারে,পুরো মাত্রায় অনুধাবন যোগ্য না ও হয়ে ওঠতে পারে। অথবা ‘দেখা’র একক কোন গুরুত্ব নাই!
‘ভবতরঙ্গ’ একটা ক্রিয়া। এই ‘ভবতরঙ্গ’ই আতঙ্কের কারণ হয়েছে! ভবতরঙ্গটা তাহলে কী? ‘ভব’ এবং তরঙ্গ। ভব শব্দ থেকেই ভাব। ভাব থেকে ভক্তি এবং অন্তে ভাগবতের স্থান। অতএব ভাব শব্দ বুঝলে অপর শব্দগুলোরও মানে পাওয়া যাবে। ভব শব্দের অর্থ হচ্ছে হওয়া। ভাব শব্দও তাই। অর্থাৎ ‘যা হয়’ বা ‘যা কিছু হয়’। ‘ভগবৎ,ভক্তি ও ভগবত এই শব্দ ক’টি নিয়ে বহুকিছু লেখা হয়েছে। কিন্তু পন্ডিতেরা সকলেই এই শব্দগুলোর উৎস ও মূল অর্থ খুঁজে বের করতে এবং ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, কেমন করে এগুলো মহাকাব্যে ও পরবর্তী সাহিত্যে যে-অর্থে চালু হয়েছিল তা কীভাবে অর্জন করে ছিল। সাধারনত মনে করা হয় “ভাগবত” নামটি আসলে বৃষ্ণি নায়ক বাসুদেব কৃষ্ণের উপাসকদের বোঝাত এবং “ভগবৎ” এই ধারনাটির উৎভব হয়েছিল তাঁর উপাসকদের মধ্যে। সুতরাং বোঝা যায় যে,ভাগবৎ ও নারায়ণের উপাসকেরা পরষ্পর অভিন্ন ছিল(কোসম্বি,এ্যান ইন্ট্রডাকশন টু দ্য স্টাডি অব ইন্ডিয়ান হিষ্ট্রি,পৃ: ২৪৫)। আরেকটি ভিন্নতর মত অনুসারে(দ্র.ভজ,মনিয়র-উইলিয়ামস,স্যন্সকৃট ইংলিশ ডিকশনারি) ভগবৎ আসলে ছিল বুদ্ধের একটি উপাধি এবং বিষ্ণুর ভক্তেরা বৌদ্ধ ধর্ম থেকে এটি গ্রহণ করে ও নিজেদের দেবতাদের বোঝাবার জন্যে ব্যবহার করে। আমরা মনে করি যে, এই দুটি মতই প্রান্তসূত্রকে ভিত্তি করে অগ্রসর হয়েছে। আমরা প্রমাণ করার চেষ্টা করবো যে, এই শব্দগুলো আসলে জড়িত ছিল নারায়ণের সঙ্গে এবং তিনিই হচ্ছেন প্রকৃত ও আদি ভগবৎ। ভগবৎ ,ভক্তি ও ভাগবত শব্দগুলির উৎপত্তি হয়েছে ভজ্ ধাতু থেকে । বৈদিক সাহিত্যের প্রাচীন ব্যবহার অনুসারে এর অর্থ হলো “বিভক্ত করা”,“ভাগ করে দেওয়া”,“কারো অংশরূপে নির্দিষ্ট করে দেওয়া”,“কারো সঙ্গে অংশীদার হওয়া”,বা “কোনও কিছুর অংশ গ্রহণ করা”(দ্র.ভগ ঐ)। এটি “পূজো করা” বা “সেবা করা” অর্থে কখনো ব্যবহার হতো না,যদিও পরবর্তী সাহিত্যে এই ধাতুটি এবং এ ধাতু থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন পদগুলির প্রচলিত অর্থ এটাই। অনুরূপভাবে ঋগ্বেদে “ভগ” কথাটির অর্থ হলো “ধন সম্পত্তি”,“ভাগ”,“সৌভাগ্যসূচক অংশ”(দ্র.বৎ,আপ্টে,স্যান্সকৃট ইংলিশ ডিকশনারি)। ‘মৈত্রী উপনিষদে অন্নকে “ভগবৎ বিষ্ণু” নামে উল্লেখ করা হয়েছে এবং বিষ্ণুুুুকে যুক্ত করে ভগবৎ শব্দটির সর্বপ্রাচীন ব্যবহার এটিই। ভগবতের সঙ্গে ভক্তি কথাটির ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে (সুবীরা জায়সবাল,বৈষ্ণবধর্মের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ,পৃ.৪৬) এবং ভক্ত শব্দের মূল অর্থ ছিল “অংশবিশেষ” বা “ভাগ” এবং কথাটির মূল অর্থ ছিল “যা কাউকে দেওয়া হয়েছে”,“যা কারো ভাগ বলে নির্দিষ্ট করা হয়েছে” বা “ যা ভাগ করে দেওয়া হয়েছে”। অর্থের প্রসারণ ঘটায় ভক্ত শব্দটি শেষে বোঝাতে লাগলো কেবলমাত্র ভাগ করে দেওয়া ধন-সম্পত্তিই নয়,কিন্তু যে-ব্যক্তি বিশেষকে ভাগ দেওয়া হয়েছে বা অংশীদার করা হয়েছে তাকেও। এই কারণেই ভক্তি ও ভক্ত শব্দ দুটির প্রাচীন ব্যবহারে কর্মবাচ্যের অর্থ প্রকাশ পায় এবং এর দ্বারা উল্লিখিত হতো এমন কোনো জিনিষ,কোন লোক যার অধিকারভুক্ত বা অংশস্বরূপ(পাণিনি ৪/ত/৯৫)।)। তাহলে ‘ভব’ শব্দের মানে হচ্ছে হওয়া বা অংশ হওয়া। ভবলীলা সাঙ্গ। মানে ‘হয়ে চলার যে চক্র’ তার সমাপ্তি।

© গোঁসাই পাহল্ভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *