কাঙাল হরিনাথের লালন সাঁই ফকির

ম. মনিরুজ্জামান

 

অখণ্ড বাংলাদেশে উনিশ শতকে সংবাদ-সাময়িকীপত্র পরিচালনা করে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-৯৬)। তিনি থাকতেন কুমারখালীতে। লালনের ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ি থেকে কুমারখালীর ‘কাঙাল কুঠির’-এর দূরত্ব ৮/৯ মাইল । লালন ও কাঙাল উভয়ে বাস করতেন কলকাতা-জোড়াসাঁকো ঠাকুর জমিদারদের বিরাহিমপুর (শিলাইদহ) পরগনায় ।

হরিনাথ মজুমদার পরিচালিত পূর্ববঙ্গের প্রাচীন সাময়িকী গ্রামবার্তা প্রকাশিকা (১৮৬৩-৮৫) আলোড়ন তুলেছিল ব্রিটিশ শাসকগোষ্টির আশির্বাদপুষ্ট জমিদার, নীলকরদের কীর্তিকাহিনী প্রকাশ করে। সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা স্মরণযোগ্য। পাঁচালি, নাটক, শিশুতোষ গল্প-পদ্য, বাউল গান, সাধনতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয়ক গ্রন্থ-পুস্তক রচনা করে মনোযোগ কেড়েছিল সেকালের অনেক বিদগ্ধ সুধীজনের। কাঙাল মাঝে মধ্যে ছেঁউড়িয়ায় যেতেন সাধক লালনের কাছে, আবার লালনও কখনো কখনো কুমারখালীতে হরিনাথের ‘কাঙাল কুঠিরে আসতেন। লালন-কাঙালের অন্তরঙ্গ বাক্যালাপের একটি ঘটনা জনইতিহাস থেকে উদ্ধার করে জানিয়েছেন বসন্তকুমার পাল। তিনি লিখেছেন- “আমি শুনিয়াছি কাঙ্গাল একদিন ফকিরকে [লালন] ডাকিয়া তাঁহার (কাঙালের) রচিত কতকগুলি গান শুনাইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “ ভাই আমার একথাগুলি তোমার কেমন লাগিল? ফকির হাসিয়া উত্তর দিলেন “তোমার এ ব্যজ্ঞন বেশ হইয়াছে, তবে নূনে কিছু কম আছে” (অর্থাৎ ভাষা কিঞ্চিৎ নীরস হইয়াছে)… ।” *১*

কথা সাহিত্যিক ও সংবাদ-পত্রসেবী লালন প্রত্যক্ষকারী এবং কাঙাল হরিনাথের স্নেহভাজন জলধর সেনের (১৮৬০-১৯৩৯) ভাষ্যে জানা যাচ্ছে ১২৮৭ (১৮৮০) সালে লালনের প্রভাবে গঠিত হয় কাঙালের ‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউল গানের দল’। এ প্রসঙ্গে জলধর সেন লিখেছেন- একবার গ্রীস্মের অবকাশের সময় শ্রীমান্ অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ভায়া বাড়ীতে (কুমারখালী) আসিয়াছেন। তিনি তখন বি, এল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হইতেছিলেন। আমি তখন স্কুলমাষ্টার। আমারও গ্রীস্মাবকাশ। আমরা তখন বাড়ীতে আসিয়া কাঙ্গালের বড় সাধের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার সম্পাদনা করি, আর অবসর সময় আমোদ আহলাদে কাটাইয়া দিই।

…অক্ষয় বলিলেন যে, “একটা বাউলের দল করিলে হয় না?” এ কথাটা মনে হইবারও একটা কারণ ঘটিয়াছিল। সে দিন প্রাতঃকালে লালন ফকির নামক একজন ফকির কাঙ্গালের সহিত সাক্ষাৎ করিতে আসিয়াছিলেন। লালন ফকির কুমারখালীর অদূরবর্তী কালীগঙ্গার তীরে বাস করিতেন। তাঁহার অনেক শিষ্য ছিল।

…. প্রাতঃকালে যখন গান হয়, তখন আমরাও সেখানে উপস্থিত ছিলাম, গানও শুনিয়াছিলাম; কিন্তু আমরা যে সে গানের মর্ম্ম ধরিতে পারিয়াছিলাম তাহা বলিতে পারি না। দ্বিপ্রহরের সেই রৌদ্রে শ্রীমান অক্ষয়ের মনে হয় ত হঠাৎ লালন ফকিরের গানের কথা উদিত হইয়াছিল; তাই সে বলিয়া বসিল “একটা বাউলের দল করিলে হয় না?” সকলেই তখন বলিয়া উঠিলেন বেশ, বেশ।” *২*

লালন-প্রভাবে প্রতিষ্ঠিত কাঙালের বাউল দলের পরিবেশিত গান অখণ্ড বাংলাদেশের নানা এলাকার গ্রামীণ লোকসমাজ থেকে ঢাকা-কলকাতার মতো নাগরিক জনসমাজ পর্যন্ত পৌছেছিল। এবং এই দলের প্রভাবে একদিকে যেমন আজব চাঁদ, রসিকচাঁদ ইত্যাদি নামে কয়েকটি বাউল গানের দল গঠিত হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি সমকালীন বেশ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক অনুপ্রাণিত হয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন বাউল গান রচনায়। ‘বিষাদসিন্ধু’ খ্যাত মীর মশাররফ হোসেন এক সময় কাঙালের রচনা করেন। পরবর্তীতে তাঁর লেখা গানগুলোর ফিকিরচাঁদ দলের জন্য বাউল গান রচনা স্থান পেয়েছে সঙ্গীত লহরী (১২৯৪/১৮৮৭) নামক পুস্তকে। সাড়া জাগানো ঐতিহাসিক গ্রন্থ সিরাজদ্দৌলা রচয়িতা অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ছিলেন ফিকিরচাঁদ দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনিও বাউল গান লিখেছেন। তাছাড়া কালীনারায়ণ গুপ্ত (১৮৩০- ১৯০৩), বিহারীলাল চক্রবর্তী (১৮৩৫-৯৪), মোহম্মদ দাদ আলী (১৮৫২-১৯৩৬), আনন্দচন্দ্ৰ মিত্র (১৮৫৪-১৯০৩), রজনীকান্ত সেন ( ১৮৬৫-১৯১০), মনোমোহন দত্ত (বঙ্গাব্দ ১২৮৪- ১৩১৬) প্রমুখ কবিসাহিত্যিক গীতধর্মী কবিতা রচনায় হয়েছিলেন বিশেষভাবে যত্নশীল; এবং তাঁদের বাউলাঙ্গের লেখা গানগুলোর পেছনে কাঙাল ও তাঁর দলের প্রভাব রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখার যথেষ্ট পরিসর আছে। কাঙাল ফিকিরচাঁদ দল প্রতিষ্ঠার পর ১৮৮১ সালের ডিসেম্বরে ফিকিরচাঁদের গীতাবলী পুস্তকটি মুদ্রিত করে দলবল নিয়ে কাঙাল প্রকাশ্যভাবে বাউল গান পরিবেশন করতে থাকেন। *৩*

বাউল গানের মুদ্রিত রূপটি কাঙালের কল্যাণে আমাদের ভাষা-সংস্কৃতির অঙ্গনে একালে তেমন প্রচলন নেই সত্য, তবে একথা ঠিক যে, লালনের প্রভাবে একদিন কাঙাল বাউল গানের দল গঠন করে তিনি এবং তাঁর দল বাউল গান রচনার ক্ষেত্রে যে ধারা তৈরি করেছিলেন; সমকাল থেকে পরবর্তীকালে সেই কাতারে সামিল হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ সহ আরো অনেকেই। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান ইতিহাস রচয়িতা সুকুমার সেন (১৯০০-৯২) মনে করেন-  “রবীন্দ্রনাথের আগে বাউলগানের-যাহাকে ইংরেজীতে বলে Vogue তাহা হরিনাথই সৃষ্টি করিয়াছিলেন। ইনি লালন ফকিরিকে চিনিতেন” *৪*

একই পরগনার অধিবাসী লালন ফকির ও কাঙাল হরিনাথের পরিচয় কবে হয়েছিল তার সঠিক খবর জানা যায় না। জমিদারি সেরেস্তায় রবীন্দ্রনাথের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে জোড়াসাঁকো ঠাকুর জমিদারদের শাহাজাদপুর ও বিরাহিমপুর পরগনায় বেশ কয়েকবার কৃষকপ্রজা বিদ্রোহ হয়েছে জমিদার, আমলাদের প্রজাপীড়ন এবং তাদের অত্যাচার- অবিচারের বিরুদ্ধে। হরিনাথ তাঁর গ্রামবার্তায় জমিদার-আমলাদের স্বার্থ বিরোধী কাজকর্মের সংবাদ-প্রতিবেদন কৃষকপ্রজাদের পক্ষে লিখতেন বলে জমিদার বাবুদের বিরাগভাজন হয়ে ক্রুদ্ধদৃষ্টিতে পড়েন। হরিনাথকে বাগে আনতে যখন কোনো কূটকৌশল কাজ হয় নি তখন এক পর্যায় তাঁকে শায়েস্তা করতে তাঁর বিরুদ্ধে নিযুক্ত করা হয় তীতু মিয়া, আব্বাস মিয়া, ঋতু মিয়া প্রভৃতি লাঠিয়াল সহ পাঞ্জাবি গুণ্ডা। *৫*। প্রতিরোধ করতে হরিনাথের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এলাকার কৃষকপ্রজা, লালন ফকির এবং তাঁর অনুসারী-শিষ্যরা। এ প্রসঙ্গে কাঙাল হরিনাথ অগ্রন্থিত ডায়েরিতে (বর্তমানে নিখোঁজ) যে বিবরণ দিয়েছেন তা সংগ্রহ করে বিশিষ্ট গণসংগীত শিল্পী ও সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস (১৯১২-৮৭) লিখেছেন-

কাঙাল হরিনাথের অপ্রকাশিত ‘দিনপঞ্জি’তে দেখি সত্যি সত্যি লালন চরিত্র-ভোলা বাউল আবার প্রয়োজন হলে হতে পারেন জাঁদরেল লাঠিয়াল। হাতের একতারাটি রেখে জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লাঠিও ধরতে পারেন। কাঙাল হরিনাথ তাঁর পত্রিকা “গ্রামবার্তা” জমিদারের প্রজা নিপীড়নের খবর ছাপানোর জন্য সেই জমিদার কাঙাল হরিনাথকে শায়েস্তা করার জন্য লাঠিয়ালের দল পাঠান, তখন লালন তাঁর দলবল নিয়ে নিজে লাঠি হাতে সেই লাঠিয়ালের দলকে আচ্ছা করে ঢিট্ করে সুহৃদ কৃষক-বন্ধু হরিনাথকে রক্ষা করেন।” *৬*

এসব ঘটনা ঘটেছিল আনুমানিক ১৮৭২-৭৩ সাল নাগাদ। সম্ভবত এ সময় লালনের সঙ্গে হরিনাথের ঘনিষ্ঠতা হয়। এর ৩-৪ বছর আগে আগে পর্যন্ত হরিনাথ লালনের খুব একটা খোঁজখবর রাখতেন বলে মনে হয় না। এ অনুমানের হেতু, ১৮৭২ সালের আগস্ট মাসে হরিনাথের গ্রামবার্তায় ‘জাতি’ নামক অস্বাক্ষরিত উপসম্পাদকীয় এক প্রতিবেদন । এখানে প্রসঙ্গত লালনের কথা বলা হয়েছে এইভাবে— “সকলেই ব্ৰাহ্ম ও ধর্ম্ম সভার নাম শুনিয়াছেন। গৌরসভা নামে নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা আর এক সভা স্থাপন করিয়াছে। লালনশা নামে এক কায়স্থ আর এক ধৰ্ম্ম আবিস্কার করিয়াছে। হিন্দু মুসললমান সকলেই এই সম্প্রদায় ভক্ত। আমরা মাসিক পত্রিকায় ইহার বিশেষ বিবরণ প্রকাশ করিব। ৩/৪ বৎসরের মধ্যে এই সম্প্রদায় অতিশয় প্রবল হইয়াছে । ইহারা যে জাতিভেদ স্বীকার করেন না সে কথা বলা বাহুল্য। এখন পাঠক চিন্তা করিয়া দেখুন, এদিকে ব্রাহ্মধর্ম্ম জাতির পশ্চাতে খোঁচা মারিতেছে, ওদিকে গৌরবাদিরা তাহাকে আঘাত করিতেছে,আবার সেদিকে লালন সম্প্রদায়িরা, ইহার পরেও স্বেচ্ছাচারের তাড়না আছে। এখন জাতি তিষ্ঠিতে না পারিয়া, বাঘিনীর ন্যায় পলায়ন করিবার পথ দেখিতেছে।” *৭*

গ্রামবার্তার বেশকিছু সংখ্যা প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হয়েছে। মনে হয়েছে, গ্রামবার্তায় অস্বাক্ষরিত, বেনামে বা ছদ্মনামে মুদ্রিত অধিকাংশ রচনার লেখক ছিলেন হরিনাথ। তবু যদি তর্কের খাতিরে এটি হরিনাথের রচনা নয় বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলেও প্রতিবেদনে উত্থাপিত বক্তব্য হরিনাথের অজানা বা অননুমোদনকৃত-এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে কোনো প্রমাণ বা তথ্য মেলে না। কাজেই সঙ্গতভাবে বলা যায়, সম্পাদকীয়-প্রতিবেদনটির রচয়িতা গ্রামবার্তার পরিচালক হরিনাথ স্বয়ং। আলোচিত বিবরণে ব্যঙ্গোক্তি ও তাচ্ছিল্যের সুর প্রতীয়মান হলেও সুষ্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, প্রতিবেদক হরিনাথ জানাতে চেয়েছেন, হিন্দু কায়স্থের সন্তান লালন সমকালে প্রচলিত ব্রাহ্মসমাজ গৌরসভা মতো এক নতুন ধর্ম আবিস্কার করেন। হিন্দু- মুসলমান অনেকে এই ধর্মের অনুসারী; এবং তারা জাতপাত স্বীকার করে না। মাসিক গ্রামবার্তায় লালনকে নিয়ে ‘বিশেষ বিবরণ’ ছাপানো প্রতিশ্রুতি থাকলেও সেই বিবরণ মুদ্রিত হয়েছিল কিনা এবং হলে তাতে লালনের ধর্মমত সম্পর্কে কি উল্লেখ ছিল; রচনাটি আমাদের হাতে যেহেতু এখনো পৌঁছায় নি, তাই জানা নেই। অবশ্য, গ্রামবার্তার ‘জাতি’ প্রতিবেদনের পরবর্তী সময়ে মুদ্রিত লালন-প্রসঙ্গ আরো দুটি মুদ্রিত কাঙাল হরিনাথের বিবরণ পাওয়া গেছে। প্রাসঙ্গিকতার কারণে তা উল্লেখ করা হলো আরো কতিপয় যুক্তি-তথ্যের আলোকে ।

 

কাঙালের-ব্রহ্মাণ্ডবেদ গ্রন্থে ছাপার অক্ষরে প্রথম সংগৃহীত লালনগীতি

‘ফিকিরচাঁদ ফকিরের বাউল গানের দল’ প্রতিষ্ঠার পরে এই দলের অনুসারীদের রচিত ‘গানগুলির মূলসূত্র ব্যাখ্যা’ ও সাধনতত্ত্ব বিশ্লেষণে হরিনাথ পত্রিকাধর্মী গ্রন্থ কাঙ্গালের- ব্রহ্মাণ্ডবেদ (১২৯২-১৩০২/ ১৮৮৫-৯৫) প্রকাশ করেন। ছয় ভাগে[খণ্ড] বের হয়েছিল কুমারখালী থেকে। প্রত্যেক ভাগ দ্বাদশ সংখ্যায় বিভক্ত। ১২৯২ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণেই সর্বপ্রথম কাঙ্গালের-ব্রহ্মাণ্ডবেদ প্রকাশ হয় প্রথম ভাগ, প্রথম সংখ্যার প্রথম সংস্করণ হিসেবে। এই প্রথম ভাগে আলোচনা-প্রসঙ্গে ২৫১ পৃষ্ঠায় লালনের নাম এবং তাঁর ‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলা খেল। সে যে, আপনি গুরু হয়, আপনি চেলা ॥’ গানটি ছাপা হয়েছে ।

কাঙাল লিখেছেন— “হৃদয় নিৰ্ম্মল হইলে ভগবানের ভাব প্রস্ফূটিত হয়, ইঁহারই নাম তাঁহার আকার, প্রকাশ, আবির্ভাব, দর্শন প্রভৃতি শব্দে সাধক ও ভক্তগণ উল্লেখ করিয়া থাকেন। ভগবদ্ভদ ব্যতিত এই প্রকাশ দর্শন আর কাহারও ভাগ্যে ঘটে না। লালন ফকীর নামে জনৈক ভক্ত এই সম্বন্ধে যে একটী গান প্রস্তুত করিয়াছেন, তাহা আমরা নিম্নে প্রকাশ করিলাম ।” *৮*

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ও প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, কাঙাল হরিনাথ কর্তৃক আলোচ্য গানই ছাপা অক্ষরে প্রকাশিত প্রথম লালনগীতি। গানটির প্রতি কাঙাল আকর্ষিত হয়ে এর অনুসরণে আরো কয়েকটি গান লেখেন। এইসব গান তিনি প্রকাশ করেছেন ব্রহ্মাণ্ডবেদে। কাঙ্গালের-ব্রহ্মাণ্ডবেদ দ্বিতীয় ভাগে হিন্দুধর্মের ‘যোগতত্ত’ সম্পর্কে আলোচনার এক পর্যায়ে ৩৬০ পৃষ্ঠায় পাদটীকায় আলোকপাত করে তা থেকে আরেকটি পাদটীকা টেনে ৩৬১ পৃষ্ঠায়

হরিনাথ উল্লেখ করেছেন— “নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া বিভাগের নিকটবর্তী ঘোড়াই গ্রামে লালনসাঁই নামে যে ফকীর বাস করেন, তিনিও পরম ভক্ত যোগী। তাঁহার গুরু সিরাজসাঁই সিদ্ধযোগী ছিলেন।” *৯*

লালনের জীবদ্দশায় প্রকাশিত উল্লিখিত বিবরণে দিপাত করলে অবহিত হওয়া যায়, কাঙাল হরিনাথ লালন ফকির সম্পর্কে জানতেন, তিনি ছেঁউড়িয়া আখড়াবাড়ির সন্নিহিত ঘোড়াই গ্রামে মৃত্যুর কয়েক বছর পূর্বে কিছুদিন বসবাস করেছিলেন। ‘লালনসাঁই’ ও তাঁর ‘গুরু সিরাজসাঁই’ ছিলেন মুসলমান সমাজের যথাক্রমে ভক্তযোগী এবং সিদ্ধযোগী; এবং তাঁদের উভয়ের ‘শিক্ষা সাধন’ ছিল ‘ হিন্দুযোগতত্ত্বের অনুরূপ’। স্মরণ রাখা দরকার, লালনকে জাতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ‘লালনশা’ কিন্তু বর্তমান বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে ‘লালনসাঁই’। তাই কাঙাল হরিনাথের বক্তব্য অনুসরণ করলে সাধককে ‘লালনশা’ বা ‘লালনসাঁই ফকির’ হিসেবে সহজে চিহ্নিত করা চলে। কাঙালের ভাষ্যে আরো বোঝা যাচ্ছে যে তিনি লালন-গুরু সিরাজ সাঁইকে জানতেন ।

জন্মসূত্র ছাড়া কেউ কায়স্থ হন না এবং যেহেতু কাঙাল-রচিত জাতি প্রতিবেদনে মুদ্রিত রয়েছে, ‘লালনশা’ হিন্দু কায়স্থ; আর কাঙালের শেষোক্ত বিবরণে দেখতে পাই, তাঁকে বলতে চাওয়া হয়েছে, মুসলমান সমাজের ফকির মতাবল্মবি সাধক। যার ফলে জাতি উপসম্পাদকীয় এবং কাঙ্গালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ দ্বিতীয়ভাগে উদ্ধৃত বিবরণ দুটির আলোকে লালনকে হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে শনাক্ত করতে গেলে একটি জিজ্ঞাসা স্বাভাবিকভাবেই মনে জাগে। তাহলো, একই ব্যক্তির কাছে লালন ১৮৭২ সালে কায়স্থ এবং পরবর্তী ১৮৮৬ সাল নাগাদ মুসলমান হলেন কীভাবে? প্রকৃতপক্ষে কাঙাল হরিনাথের বিবরণ দুটিতে পরাস্পর বিরোধী তথ্য পেশ হয় নি; সমকালে লালন সম্পর্কে বহু প্রচলিত তথ্যটিরই অনবদ্য সমন্বয় ঘটেছে। অর্থাৎ লালনের ঘনিষ্ঠজন কাঙাল হরিনাথ পারিপার্শ্বিকসূত্রে অবহিত ছিলেন, লালন হিন্দুকায়স্থ পরিবারের সন্তান, পরবর্তীতে তিনি গুরু সিরাজ সাঁইয়ের কাছে লোকায়ত গৌণধর্ম ফকিরি মতে বা বাউল- ফকির মতে দীক্ষিত হওয়া কালে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হন।

কাঙাল হরিনাথ থেকে একাল পর্যন্ত সাধক লালনপ্রসঙ্গ অনেকে আলোচনা করেছেন; এ ধারায় কাঙালের বিচ্ছিন্ন পরিবেশনা সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। লালনের জীবদ্দশায় কাঙাল তাঁর জন্মকুল, সিরাজ সাঁইয়ের কাছে দীক্ষা নেওয়া ফকিরিমত এবং এর মূল বৈশিষ্ট্য, ঘোড়াই গ্রামে বাসবাস প্রসঙ্গ আলোকপাত সহ প্রথম লালনগীতি প্রকাশ করে তিনি যে শুধু লালনচর্চায় পথিকৃতের সম্মানই অর্জন করেছেন তা নয়, সত্য বলতে কি তাঁর ভূমিকা সাধক লালনকে জানার পথও করেছে রীতিমতো সহজ-সুগম; যে কারণে লালন জীবন-পরিচিতির কিছু কিছু প্রশ্ন আজ অহেতুক মনে হয় ।

 

তথ্যনির্দেশ ও টীকা

১. বসন্তকুমার পাল, মহাত্মা লালন ফকির, ‘জীবনকথা’, ১৩৬২, পৃ. ১০৪

২. জলধর সেন, কাঙ্গাল হরিনাথ, প্রথম খণ্ড, ১৩২০, পৃ. ২২-২৪

৩. দীনেন্দ্রকুমার রায়, ‘কাঙ্গাল হরিনাথ’, ভারতী, জ্যৈষ্ঠ ১৩০৩, পৃ. ১১৪

৫. জলধর সেন, ‘কাঙ্গাল হরিনাথ’, ভারতবর্ষ, বৈশাখ ১৩৩৮, পৃ. ৭৮৩

৪. সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড, (ঊনবিংশ শতাব্দ), ষষ্ঠ সংস্করণ, ১৩৭৭, পৃ ১৬৫

৫. জলধর সেন, ‘কাঙ্গাল হরিনাথ’, ভারতবর্ষ, বৈশাখ ১৩৩৮, পৃ. ৭৮৩

৬. সুধীর চক্রবর্তী, ব্রাত্য লোকায়ত লালন, দ্বি-স ১৯৯৮, পৃ. ২৫১

৭. মুনতাসীর মামুন, উনিশ শতকে বাংলাদেশের সংবাদ-সাময়িকপত্র, দ্বিতীয় ‘খণ্ড, আষাঢ় ১৩৯৪/ জুন ১৯৮৭, পৃ. ৯১-৯২

৮. কুমারখালী ‘কাঙ্গাল কুঠির’-এ সংরক্ষিত দুষ্প্রাপ্য কাঙ্গালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ-এর প্রথম ভাগ থেকে কাঙাল পৌত্র অতুলচন্দ্র মজুমদারের (প্রয়াত) সৌজন্যে তথ্যটি সংগ্রহ করি ১৯৭৩ সালের ২৭ আগস্ট তারিখে। তথ্যটি বর্তমান লেখক প্রথম ব্যবহার করেন কুষ্টিয়া সরকারী কলেজ, সাহিত্য পরিষদ বাংলা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত একটি সাহিত্য সংকলনের প্রবন্ধে। দ্র, ‘কাঙাল হরিনাথ প্রসঙ্গত রবীন্দ্রনাথ’, বাসন্তী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৮০, পৃ. চুয়াল্লিশ ।

৯. জলধর সেনের ‘কাঙ্গাল হরিনাথ’ গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে ৫২-৫৩ পৃষ্ঠায় আলোচিত কাঙ্গালের ব্রহ্মাণ্ডবেদ থেকে উদ্ধৃতিটি সঙ্কলিত হয়েছে; কিন্তু এই গ্রন্থে লালন ও তাঁর গুরু সিরাজ সাঁইয়ের প্রসঙ্গ অংশটি বর্জিত । কাঙ্গালের-ব্রহ্মাণ্ডবেদ গ্রন্থে বর্ণিত আছে-

“নূরনবী হযরৎ মহম্মদের পরে আর কোন ভক্ত মোশল্মানকুলে জন্মগ্রহণ করেন নাই, কেহ পাছে এরূপ মনে করেন, সেই আশঙ্কায় আমরা বলিতেছি যে, মহম্মদের পর অনেক ভক্ত মোশ্যানকুল পবিত্র করিয়াছিলেন। অনেক ভক্ত ফকীরের বৃত্তান্ত অনেকেই অবগত আছেন। ফকীরদিগের মধ্যে অনেকে হিন্দু ঋষিগণের ন্যায় প্রাণায়ামদি বাহ্যোপায় অবলম্ব করিয়া শুষ্ক জ্ঞানমাত্র আশ্রয় করিয়াছিলেন। তাঁহারাই যোগ ও ভক্তি হইতে দূরে নিক্ষিপ্ত হইয়াছেন ও হইয়া থাকেন। মোশশ্মান ফকীরদিগের মধ্যে যে সকল সিদ্ধযোগী এই মর্ত্যলোক পরিত্যাগ করিয়াছেন, তাঁহারা হিন্দু ও মোশশ্মান যোগিদিগের উৎসবাদিতে সূক্ষ্ণ শরীরে উপস্থিত হইয়া থাকেন। মোশশ্মানযোগিদিগের মধ্যে যাঁহারা ভৌতিকদেহে অবলম্বন করিয়াছেন,তাঁহাদিগের শিক্ষা সাধন, হিন্দুযোগতত্ত্বেরই অনুরূপ। নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া বিভাগের নিকটবর্ত্তী ঘোড়াই গ্রামে লালনসাঁই নামে যে ফকীর বাস করেন, তিনিও পরম ভক্ত যোগী । তাঁহার গুরু সিরাজ সাঁই সিদ্ধযোগী ছিলেন।” পৃ. ৩৬০-৬১

লালন সম্পর্কে কাঙাল হরিনাথের এই বিবরণটিও মুদ্রিতাকারে আমি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করি। দ্রষ্টব্য— ‘ললিত নারায়ণই লালন ফকির’, রবিবারের দৈনিক বার্তা, রাজশাহী, ৪ জুন ১৯৭৮ / ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৩৮৫।

(. মনিরুজ্জামান এরসাধক কবি লালন কালে উত্তরকালেগ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে ২০১০ সালে প্রকাশিত হয় । উক্ত গ্রন্থ থেকে অবিকল অবিকৃতি রূপে ভক্ত/ অনুরাগী/  পাঠকের নিমিত্তে উপস্থাপন করা হল)

শেয়ার করুন:

অন্যান্য পোস্ট

ফকিরের আখড়া থেকে লালনের মাজারঃ বিবর্তন নাকি দখল ?

ফকির লালন সাঁইকে, তাঁর আঁখড়াবাড়ি নিষ্কর (কর মওকুফ) ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তৎকালীন শিলাইদহের কুঠিবাড়ির দায়িত্বে থাকা জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর। কুষ্টিয়ার

বিস্তারিত

You cannot copy content of this page

ভিক্ষার ঝুলি

ওয়েবসাইটের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে অনুদান পাঠাতে পারেন।

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫-৫