ফকিরের ঘরের চাবি ডিসি সাবের হাতে – বিধুনন জাঁ সিপাই

#To Tarique Rahman

মিস্টার প্রাইম মিনিষ্টার,

সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছে, দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এটা আনন্দের।

 

কিন্তু আমরা ফকিরপন্থীরা আপনাকে বা আপনার সরকারকে অভিবাদন জানাতে পারছি না। শুধু আপনাদের না কেবল, শতবছর যাবত আমরা কাউকেই অভিবাদন জানাতে পারি নাই। ফকিরদের আঘাত করার জন্য গদিয়ান সরকার বাহাদুরদের বাহানার অভাব হয়না। ফকির লালন সাঁইজি ইহধাম থেকে দেহরক্ষা করেছেন একশত ছত্রিশ বছর। সাঁইজি ভূলোকে বর্তমান থাকাতেও ফতোয়া জারি হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছে প্রাণের একতারা। ফকির লালন উত্তর সাধকরাও বারবার আক্রমণের শিকার হয়েছেন, প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। সে না হয়, বলবেন, ফিরিঙ্গি ব্রিটিশরাজে ওসব তো হবেই! দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে শখের পাকিস্তান রচনা করে, উন্নয়নের নামে ফকির আখড়া বানালেন ‘মাজার শরীফ’। কিন্তু আঘাত থামল না, হত্যাযোগ্য করে তোলার উস্কানী থামল না। সে না হয়, বলবেন, বিহারীরা আমাদের সংস্কৃতি চাইত না। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে, লক্ষ মায়ের বিসর্জনে আঁকলাম স্বাধীন বঙ্গভূমি। সেখানেও কি ফকিররা প্রাণের নিরাপত্তা পেল? বাংলাদেশের যতকিছু মহিয়ান, ফকির লালন সাঁইজির থেকে অধিক কিছু কি আছে আদৌও? গোটা দুনিয়াকে, বাঙ্গালীর অস্তিত্ব জানান দিতে ফকির লালন সাঁইজি ছাড়া আর কি আছে বাঙ্গালীর, বলতে পারেন? ফকিরের লীলাময় যুগলপ্রেমে আর ধ্যানস্থ আত্মদর্শন গোটা দুনিয়ার সর্বমানবকে এক সুরে বৈশ্বিক ঐক্যতান রচনা করতে পারে, একথা গোটা দুনিয়ায় চাওর হয়ে আছে। তাই সাঁইজি গোটা দুনিয়ার মানবের সেই সন্তান যে আশা জাগায়। কিন্তু তারে হত্যা করতে এদেশের মোল্লা-পুরোহিত আর সরকার বাহাদুর গণ একসাথে একযোগে ঐক্যবদ্ধ, কিভাবে? সরকার লালন একাডেমি করেছে, মূলত ফকিরদের হাত থেকে আখড়াবাড়ির কর্তৃত্ব দখল করতেই। সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ সরকারকে আখড়াবাড়ির দখল ও কর্তৃত্ব ফকিরদের হাতে তুলে দিতে আদেশ জারি করলেও আজ অবধি তা অমান্য করেছে সরকার। কেন? সোজা কথায় টাকা।

ফকির লালন সাঁইজির ষোল বিঘার আখড়াবাড়ি, একটা ব্যক্তিগত সম্পত্তি। স্থানীয় তাঁতি গণ ও মলম শাহ এই জমি সাঁইজিকে হেবা সূত্রে দিয়েছিলেন। ১৮৮৭ সাল নাগাদ সাঁইজি এই ষোল বিঘা জমি তাঁর ভক্তদের হেবা দলিল করে দেন। কুষ্টিয়া স্টেটের জমিদার কিন্তু এটাকে নিষ্কর করতে চেয়েছিলেন, তাইলে ফকির কেন তা ভক্তদের হেবা করে দিলেন? যাতে ক্ষমতাবানরা, রাজগোদি থেকে আখড়াবাড়ির কর্তৃত্ব দখল করতে না পারে। তাতে লাভ কি হয়েছে? এখন দুই/এক বিঘা জমি পাওয়া যেতে পারে। ফকিরের আখড়াবাড়ির জমি দখল করে নির্মিত হয়েছে দ্বিতল ভবন, যার নীচ তলায় ফকিরদের থাকতে হয়। ফকির গাছতলায়ই উত্তম, কিন্তু ফকিরের জমি দখল করে, দ্বিতল ভবন যে বানায় আর যারা থাকে তারা কি অধম নয়? ফকিরের ষোল বিঘা জমিতে ফকিরের ভক্ত- চ্যালারা দিব্যি প্রেমময় সাধুসঙ্গ সম্পন্ন করতে পারে। কিন্তু এখন টয়লেট করবারও যায়গা নাই, দখলী জমিতে অবৈধ স্থাপনাগুলো উৎসব/দিবসে উচ্চমূল্যের হোটেলে পরিনত হয়।

‘ঘরের চাবি পরের হাতে’ পদের মত সাঁইজির ‘হকের ঘর’ এর দক্ষিনা বাক্সের চাবি জেলা প্রশাসকের হাতে। অথচ ভক্তি দক্ষিণা তো জেলা প্রশাসককে দেয়না আশেক ভক্তগণ। সরকার কিম্বা একাডেমির কি গুন আছে যাতে এই দক্ষিণা তাদের হস্তগত হচ্ছে? রাজাধিরাজ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় দয়া করে জানাবেন। আরো জানিয়ে বাধিত করবেন, সাধুসঙ্গকে মেলা বানিয়ে, সেটাকে ইজারা দেওয়ার অধিকার আপনারা কার কাছ থেকে পেলেন? আপামর দুনিয়া থেকে লালন ফকিরের ভক্ত-অনুরাগী-প্রেমীগণ অনুদান/দক্ষিণা পাঠান, তার খোঁজ সাধু- ফকিররা জানেন না, জানেন কেবল সরকার বাহাদুর!

ফকির লালন সাঁইজির আখড়াকে মাজার বানিয়ে, সাধুসঙ্গকে মেলা বাধিয়ে, ফকিরকে বাউল সম্রাটের তকমা লাগিয়ে আপনাদের ব্যবসা উত্তরাত্তর বৃদ্ধি করেও আপনাদের কূপমন্ডুকতা থামেনি। মোল্লা-পুরোহিত আর সরকারের সম্মিলিত হ*ত্যা মিশন থেমে নেই। কিভাবে? পুরানো কাসুন্দি আর না ঘেটে, হাল কার্তিকের তিরোধান স্মরণ দিবসের কথা ধরা যাক। অনায়াশে মোবাইল হাম্বাদিকরা ক্যামেরা নিয়ে যাচ্ছেতাই ভিডিও করছে, যেন আমরা ফকিররা, তেজারতি মাল। আমাদের প্রাইভেসি, ফকিরের নিজস্ব রীতিনীতি বলতে কিছু নাই। সব ভিডিও করবে, আর স্যোশাল মিডিয়ায় উস্কানিমূলক ক্যাপশন দিয়া পোষ্ট করে, ফকির সাধুগণের জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলছে। আবার, সাঁইজির আখড়াবাড়িতে প্রবেশের মুখে আর মাঠের গেটে মিনিমাম দুইটা ‘মেটাল ডিটেক্ট’ থাকতে দেখা যেত। পিপ পিপ আওয়াজ হত, সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, নিরাপত্তা কর্মীরা বা পুলিশ সদস্যরা। কিন্তু এবারে আমরা কি দেখলাম, পুলিশ তো দূর কি বাত, কোন ‘মেটাল ডিটেক্ট’ তো ছিলই না, গেট ছিল উদাম দিগম্বর। হুহু করে বাণের জলের মত মানুষ আসছে, ভাবুক-ভক্তের থেকেও উচ্ছৃঙ্খল বিপদগামী তরুণের মিছিল ছিল অধিক। ফকিরের দ্বারে সকলেই আসবে, অভাবুক টিকবে না সেকথা সত্য। কিন্তু এর মানে তো এই নয় যে, নিরাপত্তা নজরদারি থাকবেনা? অনুষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব তো জেলা প্রশাসনের তথা সরকারের। টাকা তুলছে সরকার আর দায় কার? পহেলা কার্তিক উত্তর রাত দেড়টা নাগাদ, আখড়াবাড়ির গেট তালাবদ্ধ পেলাম এবং পুলিশ দেখলাম। ভীড় ঠেলে গেটের কাছে এসে পুলিশকে বললাম, ‘ভিতরে যাব আসন আছে’। পুলিশ জানালো, ‘সে থাক এখন ভিতরে যাওয়া যাবেনা, বো*ম পাওয়া গেছে, ডিসপোজ না হওয়া অবধি ভিতরে যাওয়া যাবেনা’। বো*ম যেন মাথায় পড়ল! এ কথা কে কবে শুনেছে, ফকিরের আশ্রমে এমন হ*ত্যার আয়োজন। শংকিত ও বিরক্ত হয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সকাল ৭.৪৫ নাগাদ আসনে থাকা আমাদের লোক জানালো, পুলিশ এসে তাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে উঠিয়ে বলেছে, এখনই সবকিছু নিয়ে বের হয়ে যেতে হবে। হন্তদন্ত হয়ে আখড়াবাড়ির গেটে আসলাম, পুলিশ পেলাম। ভিতরে যেতেই বলল, আপনি একা যেতে পারবেন, কাউরে নিতে পারবেন না। বললাম, গুরু-আসনে অনেক জিনিসপত্র একা আনা সম্ভব না। পুলিশ প্রতিজ্ঞা করেছে, কিছুই শুনবে না। গেটের বাইরে ভাইদের রেখে, একাই সবকিছু মাথায় বয়ে আনলাম গেট অবধি। এখন কথা হল, নিরাপত্তা দেবার দায়িত্ব সরকার বাহাদুরের, উনি ব্যর্থ হয়েছেন। কিন্তু জোরপূর্বক আসন ত্যাগ করতে বাধ্য করা হল সাধু-ফকিরদের। ইজারা তুলে, মেলায় ধান্দা-ফিকির করে, মিডিয়াবাজি করে টাকা-পয়সা কামালেন সরকার ও তার পান্ডারা, আর নিজ আদি আখড়ায় অপদস্ত হতে হল সাধু-গুরুদের। বো*মা আতংকের এই ঘটনা যে খুব সস্তা স্ক্রিপ্ট নির্ভর তা বোঝা গেল, যখন দোশরা কার্তিক সকাল ১০ টার দিকে আখড়ার গেটে ‘মেটাল ডিটেক্ট’ আর পুলিশের চেকিংয়ের তৎপরতার দেখা মেলে। সাধু-ফকিরদের জোরপূর্বক বের করে দিয়ে, কার জন্যে এই নিরাপত্তা? তবে কি সাধু-গুরুদের জীবনের কোন দাম নাই রাজাধিরাজের দরবারে? নাকি এসব আতংকের ঘোলা পানিতে অন্য মাছ শিকারের দুরভিসন্ধি? জানিনা তবে জেনে যাব শীঘ্রই।

ফকিরের নিজভূমে, ফকিরকেই ব্রাত্য করার এই শতবছরের প্রকল্পের বিপক্ষে প্রতিকল্প হাজির হওয়ার সময় এসে গেছে। ফকির লালন সাঁইজি তার ভাব-ভক্তি-দর্শনের পথ-মত পালনে-যাপনে তার ভক্তদের জন্য সকল কিছু দিয়ে গেছেন। প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকারের, সংস্কৃত ব্যবসার উপাদান হইতে সাঁইজির আগমন নয় এই ধরাধামে। তিঁনি এসেছেন, জীব তাড়িতে, ভক্ত উদ্ধারিতে। ঘোর অনাটনের অকাল কার্তিকে ভক্তকে গুরু আশ্রমে নায়র কইরা আনতে, ফকির দেহরক্ষা করেছেন পয়লা কার্তিকে। ভক্ত কোন জমিতে বসে ধ্যান সাধন করবেন, তা তিঁনি করে গেছেন। রেখে গেছেন, গুরু পরম্পরায় সাধু-ফকিরদের। যাঁরা এমন মচ্ছ্বব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করবেন অনায়াসে। সেই আঠারো শতকে, ফকির লালন ১২শতাধিক অর্থ খরচ করে সাধুসঙ্গ দিতেন। এবার বলেন সেই সময়ে এত টাকায় কতবড় সাধুসঙ্গ হত? এখনো ফকিরি ঘরানার আখড়াগুলোতে যে সাধুসঙ্গ হয়, তা সুশৃঙ্খল শান্তিপূর্ণ ও মাধুর্য্যময় আবহে সম্পন্ন হয়। কেননা ফকিরের মত পথই তো শান্তির – সৌহার্দ্যের – প্রেমের। সেই ফকিরকে আখড়াচ্যূত করেছেন আপনারা ক্ষমতাসীনরা বহু আগেই। এখন উত্তরসন্তরা দু’দিনের জন্য ছেঁউড়িয়ায় আসলেও, প্রাণ হাতে নিয়ে আসতে হচ্ছে। এর দায় কার? ফকির প্রেমের কাঙ্গাল, কোন কালেই রাজস্বীকৃতির দাবীদার ছিলনা। প্রকল্পবাদী সরকারপক্ষ, হাল আমলে জাতীয় দিবস বানিয়েছেন এবং তখনই এইসব বো*মাতঙ্ক দেখা দিচ্ছে, এর অর্থ কি ধরে নেব আমরা? জাতীয়ভাবে আমাদের নি*ধন করার মিশন! তাইলে তো ফকিরের গীত গাইতে হবে-

❝চোরের সাথে খাটে না ধর্মদ্বারা

হাতের অস্ত্র করনা হাতছাড়া❞

শাস্ত্র আর অস্ত্র কোনটাই ফকিরের লাগেনা। কেননা পরের লাইনেই ফকির গেয়ে উঠছে-

❝অনুরাগের অস্ত্র ধরে দুষ্ট দমন করে

স্বদেশে গমন কররে তোরা❞

দুষ্ট দমনের তত্ব শুদ্ধভাবেই ফকিরের জানা আছে। তা নইলে শতবছরের পরিকল্পিত আক্রমনেও আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি, আগামী সহস্র বছরও সে বাতি জ্বলবে। দুষ্ট দমন তত্ব না জানলে, ফকিরের মোক্ষলাভ হইত না, নির্বান প্রাপ্তি হইত না, আর হইত না সেরূপ দরশন। কোন সে রূপ-

❝ধ্যানযোগে তোমায় দেখি

তুমি সখা আমি সখি

মম হৃদ মন্দিরে থাকি

দাও ঐ রূপ দরশন❞

ফকির লালন সাঁইজির আখড়ার দায়-দায়িত্ব উত্তরসাধকদের হাতে তুলে দিন, মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের, আপীল বিভাগের আদেশানুসারে। অন্যথায় একাডেমি ও সরকার বাহাদুরের নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং অবৈধ দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফকিরকে আত্মরক্ষার রাস্তা বেছে নিতে হবে। আত্মরক্ষা দ্বারা ফকির বিশ্বরক্ষার সুবিশাল ভাব বহন করে চলছে, তাঁর সাধনায় বিঘ্ন ঘটাইয়েন না। আখেরে সেটাই সর্বমঙ্গল।

জয়গুরু।

বিনয়াবনত

০৬ কার্তিক ১৪৩৩

বিধুনন জাঁ সিপাই

লালন ঘরানার ভক্ত ও সেবক

www.lalonfakir.com

শেয়ার করুন:

অন্যান্য পোস্ট

কাঙাল হরিনাথের লালন সাঁই ফকির

ম. মনিরুজ্জামান   অখণ্ড বাংলাদেশে উনিশ শতকে সংবাদ-সাময়িকীপত্র পরিচালনা করে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-৯৬)। তিনি থাকতেন কুমারখালীতে।

বিস্তারিত

You cannot copy content of this page

ভিক্ষার ঝুলি

ওয়েবসাইটের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে অনুদান পাঠাতে পারেন।

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫-৫