লালন ফকিরের আয়নাঃ অধ্যায় এক – নিগূঢ়ানন্দ

লালন ফকির তার গানে প্রায়ই আর্শিনগর বা আয়না মহলের কথা উল্লেখ করেছেন। যোগ অনুযায়ী মানব দেহে যে ষট্‌চক্র আছে তার কোথায় যে এই আয়না মহল আছে আমি আজও তা ঠাহর করতে পারিনি। তবে বাউলদের দেহতত্ত্বে আমাদের যচক্রের মত ছটি চক্র নেই। তারা চারটি চক্রে বিশ্বাস করে। তার মধ্যে আজ্ঞা চক্রের গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানেই তাদের মনের মানুষ বাস করে। সেই মনের মানুষের চেহারা কি রকম? লালন বলেছেন :

“তার হস্ত পদ স্কন্ধ মাথা নাইরে।”

এই চক্রগুলো আসলে হল এক ধরনের শক্তির আবর্ত। এই জন্য বৈদিক সাহিত্যে একে ‘জট’ বলা হয়। সুষুম্না নাড়ির মধ্য দিয়ে এই জটগুলি গিয়েছে। একে চক্র বলা হয় এই কারণে যে, এগুলি গতিশীল। কুলকুণ্ডলিনী মূলাধার থেকে ঊর্ধ্ব দিকে ওঠার সময় এক একটি জটকে তেজদৃপ্ত করলে দেহের বিভিন্ন স্নায়ুতন্ত্রী উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। এই জটগুলি দেহের যেসব ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে যুক্ত সেগুলি সেই ধরনের ক্রিয়াশীল হয়ে মানুষের অন্তরের মধ্যে সেই সেই ধরনের ইন্দ্রিয়জ ভাবনা ও দৃশ্য তৈরি করে। এই জটগুলিকে জীববিদ্যার বিজ্ঞানীরা gland বলেন।
এই ষট্‌চক্রের নাম হিন্দু যোগশাস্ত্র মতে মূলাধার (লিঙ্গমূল ও গুহ্যদ্বারের মাঝখানে) স্বাধিষ্ঠান (তলপেটে নাভির নিচে), মণিপুর (নাভিঅঞ্চলে) অনাহত (হৃদয়ে) বিশুদ্ধ (কণ্ঠে) ও আজ্ঞা চক্র (দুই ভ্রুর মাঝখানে)।

এই চক্রগুলিকে জীবন বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন গ্রন্থ বলে উল্লেখ করেছেন, যেমন—

১। মূলাধার (Coccyx)
২। স্বাধিষ্ঠান (Sacral Plexus)
৩। মণিপুর (Solar Plexus)
৪। অনাহত (Cardiac Plexus)
৫। বিশুদ্ধ (Thoraxic)
৬। আজ্ঞা (Pituitary)

এই চক্রগুলিকে উপর থেকে নিচের দিকে যেভাবে লেখা হল, আসলে এগুলো মানুষের দেহে আছে ঠিক উল্টোটাভাবে। অর্থাৎ আজ্ঞাচক্র যাবে উপরে এবং অন্যান্যগুলি একের পর এক নিচ থেকে উপরের দিকে। ছবি এঁকে দেখানো হল।

কুলকুণ্ডলিনী মূলাধার চক্রে নিদ্রিত থাকে। শ্বাসপ্রশ্বাসের আঘাতে ক্রমশ নিচে থেকে উপরে ওঠে। ওঠে এইভাবে—

এই চক্র বা জট বা glandগুলি থেকে কুণ্ডলিনী জেগে উঠলে চোখ বুজে থাকলে নানা ধরনের বর্ণ দেখা যায়। এই জন্য অনেকে মানুষের দেহকে colour box বলে বর্ণনা করেছেন। এই বর্ণগুলি নানা যোগীর মতে নানা রকম। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতাতে বর্ণগুলি এইরকম:

মূলাধারে কুলকুণ্ডলিনী জেগে উঠলে লাল রং দেখা যায়। স্বাধিষ্ঠানে কুলকুণ্ডলিনী উঠলে সবুজ বৃত্ত দেখা যায়। ক্রমশ তা হালকা হতে হতে জলো জলো হয়ে যায়। মণিপুরে কুলকুণ্ডলিনী উঠলে গ্রীষ্মের দগ্ধ আকাশের মত দেখায়। সাদা সাদা উজ্জ্বল ধুঁয়া ধরনের মেঘ দেখা যায়। অনাহতে উঠলে এই মেঘ আরও উজ্জ্বল হয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের মত হয়ে যায়। ফাঁকে ফাঁকে নীল আকাশ চোখে পড়ে। বিশুদ্ধে উঠলে গভীর নীল আকাশ চোখে পড়ে। আজ্ঞাচক্রে উঠলে তীব্র জ্যোতির মত চোখে পড়ে। আরও উপরে উঠলে জ্যোতির তীব্রতা আরও বাড়ে। আরও উঠলে স্বচ্ছধরনের একটা ভাব হয়। তার উপরে উঠলে ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে আসে।

এই এক একটা চক্রে বা gland-এ শক্তি উঠলে মনের ভাবেরও পরিবর্তন ঘটে। মূলাধারে কুলকুণ্ডলিনী জেগে উঠলে যৌন ইন্দ্রিয়গুলি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। স্বাধিষ্ঠানে উঠলে ছোট ছোট কামনা বাসনার ইন্দ্রিয়গুলি বেশি সক্রিয় হয়। মণিপুরের উঠলে ভাবাবেগ বা ইচ্ছা শক্তি বেড়ে যায়। অনাহতে এই শক্তি উঠলে—বৃহত্তর প্রাণশক্তি ও আবেগ জেগে ওঠে। আত্মিক শক্তি বাড়ে। বিশুদ্ধে কুলকুণ্ডলিনী উঠলে মস্তিষ্ক-স্নায়ুর সঙ্গে দৈহিক ইন্দ্রিয়গুলির সরাসরি যোগ হয়। দিব্যচেতনার সঙ্গে স্থূলমনের যোগ হয়। আজ্ঞা চক্রে কুলকুণ্ডলিনী উঠলে দুই ভুরুর মাঝখানটা ফুলে ফুলে উঠে ফেটে যেতে চায়। আন্তর দর্শন হয়। গতিময় মন নিয়ন্ত্রিত হয়। ইচ্ছাশক্তি বৃহত্তর হয়ে প্রকাশ পায়। মন সাধারণ মানসিকতার উপরে চলে যায়। অন্তদৃষ্টি খুলে যায়। মনের চোখে নানা জিনিস ধরা পড়ে। এখান থেকেই যোগ-মানসের আরম্ভ। এর উপর আরো তিনটি স্তর আছে। যেমন আনন্দ, চিৎ ও সৎ। আনন্দে তীব্র দিব্যজ্যোতি খেলা করে। তার উপর দর্পণ-স্বচ্ছতা দেখা দেয়। তার উপর সৃষ্টির আদি অন্ধকার। এখানে এলে যোগী সর্বজ্ঞ হন।

কিন্তু বাউলেরা আজ্ঞাচক্রের উপরে আর যেতে চাননি। তাদের ঈশ্বর বলুন, মনের মানুষ বলুন যাই বলুন, সবার বাস এখানে। তাই লালন বলেছেন :

দ্বিদল পদ্মে বারাম তার

দল নিরূপণ হবে যাহার

ও সে দেখবে অনায়াসে।

এই দ্বিদল পদ্মই হল আজ্ঞা চক্র। তন্ত্রে এই চক্রকে আঁকা হয়েছে এই ভাবে :

জীবন বিজ্ঞানীরা একেই বলেছেন— pituitary gland। কারো কারো মতে pineal gland।

লালন কুলকুণ্ডলিনীকে এখানে উঠিয়ে যে অনুভূতি পেয়েছেন তা থেকেই বলেছেন :

“আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা

মধ্যে মধ্যে ঝল্কা কাটা

তার উপরে সদর কোঠা…

আয়না মহল তায়।”

 

আর একটি গানে বলেছেন-

“আমার ঘরের কাছে আরশীনগর

এক পড়শী বসত করে।

………

তার হস্তপদস্কন্ধ মাথা নাইরে-

সে ক্ষণেক থাকে শূন্যের উপর

ক্ষণেক ভাসে নীরে”

তবে সর্বোপরি একটি চক্রের কল্পনা যে তারা করেনি তাও নয়। একেই বলা হয়—সহস্রার। এখানে শক্তি উঠলে সব জ্ঞানই হয়। এদের চার চক্র এই রকম :

প্রথমা চক্র-

মূলাধার

স্বাধিষ্ঠান

মণিপুর

দ্বিতীয়া চক্র-

অনাহত

বিশুদ্ধ

তৃতীয়া চক্র-

আজ্ঞা

চতুর্থী চক্র-

সহস্রার

তবে আজ্ঞা চক্রকে বিশেষ মূল্য দেওয়া হয়েছে। এই আজ্ঞা চক্র জীবনবিজ্ঞানের gland হিসেবে যে কোন্ gland সেটাই প্রশ্ন। শক্তি এখানে উঠলে দুই মাঝখানটা ফুলে ফুলে উঠে ফেঁটে যেতে চায়। একথা বলতেই ভেষজ অষুধ ভুরুর নিয়ে গবেষণারত ড. অনীতা পাকড়াশী আমাকে একদিন একটি ইয়া মোটা বই এনে দেখালেন যে এখানে (দুই ভ্রুর মাঝখানে) থাকে পিনিয়াল গ্ল্যান্ড। এই পিনিয়াল গ্ল্যান্ড মানুষের মধ্যে এখন আর কার্যকরী নেই। পশুর মধ্যে আছে। ফলে পশুদের কতকগুলি বিশেষ ক্ষমতা আছে—যে ক্ষমতাগুলি মানুষ হারিয়ে ফেলেছে। পিনিয়াল গ্ল্যান্ড কার্যকর থাকার জন্য পশুরা অন্ধকারের মধ্যে দেখতে পায়। তাদের দূরদৃষ্টি আছে। ঘ্রাণশক্তি প্রবল। বহু দূরের শব্দ শুনতে পায়—যেগুলি মানুষের কানে অশ্রুত। তিনি আমাকে দুই ভুরুর মাঝখানেই পিনিয়াল গ্ল্যান্ড দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে গবেষণারত যাঁরা তারা পূর্বে সন্নিবেশিত ছবিতে যে ভাবে পিটুইটারি গ্ল্যান্ড দেখিয়েছেন—তাতে একে পিনিয়াল গ্ল্যান্ড বলে মনে হয় না। পিনিয়াল গ্ল্যান্ড-এর অবস্থান আর একটু পরে। তবে কুলকুণ্ডলিনী দ্বারা এই গ্ল্যান্ড-এ শক্তি সঞ্চারিত হলে অদ্ভুত অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। অনেক সময় মানসনেত্রে সঞ্চরমান জ্যোতি ভেদ করে স্বচ্ছ দিনের আলোর মত অবস্থা হয়। তাতে অদ্ভুত অদ্ভুত সব ছবি দেখা যায়। এই অবস্থাটাকেই হয়তো লালন ফকির আর্শীনগর বা আয়না মহল বলেছেন। পিনিয়াল গ্ল্যান্ড ও পিটুইটারি গ্ল্যান্ড সম্পর্কে বিজ্ঞান যা বলেছে তা এই রকম :

পিনিয়াল গ্ল্যান্ড :

Descartes hasten to assure us that if the body proper is a machine, it is governed by soul or mind. The mind comes into contact with the body proper within the conarion, later identified with the tiny pineal gland at the base of the brain; from there it is radiated through the rest of the body by means of the nerves and even the blood.

আত্মা বা মন pineal gland-এ বাস করে বলে তার বিশ্বাস ছিল। সেই ক্ষেত্রে বাউলদের চিন্তাধারার সঙ্গে তার নিবিড় সমতা লক্ষ্য করা যায়। Pituitary gland: এই গ্ল্যান্ড-এর কাজ হল The hormones produced by the posterior lobe of the pituitary gland are also extremely important. They act upon smooth muscle and upon the pigment cells and they affect blood pressure. The hormone called pitressin causes small blood vessels to contract and brings about active movement of the intestinal muscles; it also regulates the amount of water in the body” সুতরাং দেখা যায় যে, পিটুইটারি গ্ল্যান্ড-এর প্রভাব স্থূলদেহের উপরই বেশি। ফলে লালনের দ্বিদল পদ্মই হয়তো শাই, গুরু বা মনের মানুষের বাসস্থান। শব্দে তার রূপরেখা আছে কিন্তু আকৃতিতে নেই। সেক্ষেত্রে “তার হস্তপদস্কন্ধ মাথা নাই রে” যথার্থ বর্ণনা। এখানে কুলকুণ্ডলিনীকে ওঠালে অকস্মাৎ অকস্মাৎ আয়না মহল বা আর্শীনগরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়, যে আর্শীনগরে প্রত্যক্ষ দিনের আলোর মত নানা ছবি দেখা যায়। আমার নিজের জীবনে আর্শীনগরের সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। ফলে যীশুখ্রীস্টের একটি বাণীর সত্যতা আমার কাছে প্রমাণিত হয়েছে। বাণীটি এই: Life everlasting | জীবন চিরস্থায়ী। স্থূলদেহের মৃত্যুই জীবনকে শেষ করতে পারে না। স্থূলের পর সূক্ষ্ম একটা সত্তা থেকেই যায়। এই সূক্ষ্ম সত্তাও আরও সূক্ষ্মতর সত্তায় রূপান্তরিত হয়।

আজ্ঞা চক্র বহুদিনই বোধহয় আতিক্রম করে এসেছি। এখন আর দুই ভুরুর মাঝখানটা আগের মত ফুলে উঠে ফেটে যেতে চায় না। এখন শুধু আলো আলো আর আলোই দেখি। আজ্ঞা চক্রের উপরে মস্তিষ্ক-স্নায়ুতে আমি এখন আর কোনো চক্রের কল্পনা করি না। বরং তিনটি স্তর আছে বলে অনুমান করি। স্তর তিনটি নিচের দিক থেকে উপরের দিকে এই রকম : আনন্দ, এখানে আছে শুধু অপরিচ্ছিন্ন জ্যোতি আর জ্যোতি। তার উপর স্বচ্ছ একটা স্তর—যাকে বলা যায়—চিৎ এবং তার উপর নিবিড় অন্ধকার। একেই বলা হয় সৎ। এই তিনটি স্তর মিলেই পরম পুরুষ রয়েছেন সচ্চিদানন্দ রূপে। মস্তিষ্কে সর্বোপরি স্থানকে অনেকে বলেন সহস্রার। এই সচ্চিদানন্দকেই বোধহয় বাউলেরা একটি চক্র বলে ধারণা করেছেন। যার নাম তারা করেছেন সহস্রার। এই সহস্রার নিয়ে তাদের চারটি চক্র। পশ্চিমীরা এই সহস্রারকে বলেন—Crown Chakra। এর উপরেও অনেকে চক্রের কল্পনা করেছেন। এটা স্থূল দেহে নেই। আছে স্থূলদেহের উপরে যে বায়ো-প্লাজমিক দেহ আছে সেখানে। সহস্রার বা crown চক্রের তিন চার ইঞ্চি উপরে এটা থাকে। কুলকুণ্ডলিনীর তাপে যদি এই চক্রটি উত্তাপিত হয় তাহলে এই চক্রই বায়োপ্লাজমিক দেহ ও আত্মিক দেহকে যুক্ত করে। কুলকুণ্ডলিনী এই চক্রদ্বারা উত্তাপিত হলেই যোগীরা স্থূল জগতের বন্ধন অতিক্রম করে সূক্ষ্মজগতে বিচরণের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এক বিশ্ব থেকে ভিন্ন বিশ্বেও তাদের সূক্ষ্ম দেহ যাতায়াত করতে পারে।

আমি মৃত্যুর পরে সূক্ষ্ম একটা জীবন থাকে কিনা তা জানার জন্য বহুরকমে অনুসন্ধান করেছি। তাতে বহু সূক্ষ্মদেহীর সাক্ষাৎ পেয়েছি। তবে সর্বত্র, সবসময়ই যে এদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তা নয়। কখনও কখনও জীবাত্মাকে দিনের আলোর মত আলোতে স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। এই যে দিনের আলোর মত স্পষ্ট আলো সেটা আমাদের দেহের মধ্যেই কোথাও আছে। দেহের যে মৌলশক্তি তা দুই ভুরুর মাঝখানটায় চলে এলে আলোর একটা আর্শীর ন্যায় স্বচ্ছ অবস্থা দেখা দেয়। মুহূর্তের মধ্যে যে স্বচ্ছস্তর ঝলক দিয়ে ওঠে তাই মানুষের দেহের মধ্যে লালন ফকিরের আয়না মহল।

এই আয়না মহলের দেখা পেতে হলে মনকে অন্তস্তলের গভীরে ডুবিয়ে দিতে হয়। পরমাত্মিক মানস নিস্তরঙ্গ পুকুরের মত। যেখানে আসলে স্বচ্ছতা ছাড়া আর কিছু নেই। আমাদের মানবদেহের মধ্যেও তেমনই একটা স্বচ্ছতা আছে। এই স্বচ্ছতা পরমাত্মিক স্বচ্ছতা। কিন্তু আমাদের কর্মফল কুচুরি পানার মত। দিনকে দিন তা আত্মিক স্বচ্ছ স্তরের উপর ভেসে এসে সেই স্বচ্ছতাকে ঢেকে দেয়। ফলে আকাশের ছায়া পরমাত্মার স্বচ্ছতার মধ্যে প্রতিবিম্বিত হতে পারে না। এই আত্মা স্বচ্ছজলের একটা বালতির মত। ধরা যাক তাতে বেশ নোংরা জমেছে। যদি সেখানে ছোট একটা বালতি ডুবিয়ে দেওয়া যায়—তাহলে বড় বালতির উপরের নোংরা জল উপচে পড়ে যাবে। আমাদের মনও হল এই ছোট বালতির মত। যত ভেতরে ঢুকবে ততই আমাদের অন্তরের অন্তস্তল থেকে কর্মফলজাত নোংরা জলগুলিকে বের করে দেবে। ফলে অন্তরের স্বচ্ছতা স্বমহিমায় ফুটে উঠবে। তাতে বিশ্বের আকাশের প্রতিবিম্ব পড়বে। এইজন্য ধ্যান করলে অন্তরের স্বচ্ছতা বেড়ে যায়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের নানা ছায়া সেখানে পড়ে। বাইরের জিনিসের ছায়া ভেতরে পড়ে মানসনেত্রে ধরা পড়ে গেলে—তা দেখে কেউ যদি কোনো রকম বক্তব্য রাখেন সাধারণ মানুষ তাতে আশ্চর্য হয়। Sagan-এর মত জ্যোতির্বিদ এই নোংরা জল বের করাকে বলেছেন— “Our inside turns out.”। হৃদয়ের মধ্যে যে আকাশ আছে তা বাইরে চলে আসে। ধ্যানীরা চোখ বুজে সেই আকাশটাকেই দেখতে পান। ভেতরের এই আকাশটাকে দেখলে বাক্ হারিয়ে ফেলতে হয়। তখনই যোগসাধনারত কোনো কবি লিখে ফেলেন :

“ভাবিস তুই ক্ষুদ্র কলেবর ইহাতেই অসীম নীলাম্বর।”

এই নীলাম্বরেই স্থূল দেহের মৃত্যুর পর আত্মা ভাসমান থাকে। যোগীরা এই দেখেই মৃত্যুর পরেও যে সূক্ষ্ম একটা অস্তিত্ব আছে সে কথা বলে থাকেন। এদেরই ছবি সৌভাগ্যক্রমে আমি দেখেছিলুম বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে যে স্থুল দেহের মৃত্যুর পরই সব শেষ হয়ে যায় না।

কুলকুণ্ডলিনী আজ্ঞাচক্রে উঠলে যে জ্যোতিদর্শন হয় সেই জ্যোতিই হল পূর্ণ চিৎশক্তিময়। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সবই তার পূর্ণবিস্তারের মধ্যে ঘটে আছে। যেখানে এই জ্যোতি আছে সেখানে তিনি মানসনেত্রে ধরা দিয়ে থাকেন। যেখানে সেই জ্যোতি নেই সেখানেও তিনি আছেন। মানবদেহের বিশুদ্ধ চক্র হল আকাশের স্থান। বৈদিক সাহিত্যে আকাশকে বলা হয়েছে অদৃশ্য আলো। ‘কাশ’কে বলা হয়েছে প্রকাশিত আলো। আগে ধরা হয়েছিল ইথার নামক কোনো এক সত্তা দ্বারা আকাশ প্লাবিত। আলোর মাধ্যম হিসেবে এই ইথারই কাজ করে। তবে ইদানিং বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে ইথার জাতীয় কোনো কিছু নেই। আকাশের উপাদান বিজ্ঞানে ধরা পড়েনি। আলোর চলাচলের জন্য কোনো মাধ্যমের প্রয়োজন হয় না। তবু যোগীদের চোখে আকাশ নানা রঙে উদ্ভাসিত হয়ে ধরা দিয়েছে। আমার চোখে এর বর্ণ ধরা পড়েছে নিবিড় নীল। শ্রী অরবিন্দ আকাশের রঙ দেখেছেন ধূসর হিসেবে। অন্য কোনো যোগীর চোখে হয়তো আরও ভিন্ন রঙ ধরা পড়েছে। হতে পারেই। নিরাকার যদি বহু বিচিত্র আকার ধারণ করতে পারেন— তাহলে রঙহীন কেন বিচিত্র রঙ ধরতে পারবেন না? আসলে ঈশ্বর বহুরূপী। কখন কোন্ রঙ ধরবেন কেউ বলেত পারে না। আজ্ঞাচক্রের উপরে চিৎশক্তিময় যে অবিচ্ছিন্ন জ্যোতি রয়েছে—তা আমাদের স্থূল জগতের দুয়ার দিয়েও ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমাদের স্থূল চোখে তা দেখতে পাইনা এই যা। নইলে আমাদের চারপাশে ফাঁকফোকর কিছু নেই। সবই আলোয় ভর্তি। সব কিছুই চিৎশক্তিময়। বিশ্বসংসার শুদ্ধ এই চিৎশক্তির মধ্যেই রয়েছে। যেখানে সৃষ্টি সেখানেই তিনি। ইনিই ভারতীয় তন্ত্রশাস্ত্রে কুলকুণ্ডলিনী। খ্রিষ্টানদের তিনি Holy spirit। ভারতীয় তান্ত্রিকদের কাছে মা কালী। সাধকরা মায়ের এই স্বরূপ জানতেন বলে গান লিখেছেন ‘শ্যামা মা কি আমার কালো রে…” তিনি বিচিত্র বর্ণময়ী একান্নক্ষরা দেবী। আমরা তার কোলেই বসে আছি।

যে অখণ্ড জ্যোতি (Plasma) থেকে এই বিচিত্র বিশ্বের জন্ম তার কিছুটা যেমন ঊর্ধ্বলোকের জ্যোতির মধ্যে আছে—আবার কিছুটা অদৃশ্য প্রবাহ হিসেবে আমাদের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এর মধ্যে কত যে প্রাণের ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে! একে অনেকে psi plasma বলেন। সাধারণ মানুষের আধো ঘুম আধো জাগরণের মধ্যে যখন ব্যক্তিত্বের তরঙ্গগুলো বাইরের কোনো জিনিসের দেহের ভেতরে ঢোকা বন্ধ করতে পারে না ঝিমিয়ে পড়ে তখন এই অদৃশ্য প্লাজমাগুলো দেহের দুর্বল স্থানের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই প্লাজমাগুলোকে বলে psi plasma । এই psi- plasma কোনো ব্যক্তির মানসসত্তা সম্পন্ন প্লাজমা। ঘুমঘুম ভাবে মানুষের বায়ো- প্লাজমিক বডিকে অগ্রাহ্য করে সেগুলো তখন মস্তিষ্কের কম কর্মচঞ্চল এরিয়াতে আছড়ে পড়ে। তখনই লোকে নানা ধরনের ছবি দেখতে পায়।

ঘুমঘুম-ভাব-লোকের মানসনেত্রে তখন সেই প্লাজমা অনুসারে ছবি ফুটে ওঠে। আসলে দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টাই psi plasma-গুলি ছুটে চলেছে। বায়োপ্লাজমিক যে উপাদান দিয়ে মানুষের স্থূলদেহের উপরের কোষগুলি গঠিত এই প্লাজমাও তাই দিয়ে গঠিত। কোথাও দুর্বল প্লাজমা পেলে সেখানে ঢুকে পড়ে স্বপ্ন জাতীয় ছবির চিত্র তুলে ধরে। রাতে ঘুমের মধ্যে ব্যক্তিত্বের তরঙ্গগুলি নিস্তেজ হয়ে পড়লে এই জন্যই বুঝি লোকে স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নের বহু ছবিই এইভাবে প্লাজমা বাহিত ছবি। এই প্লাজমা বাহিত ছবির ঘটনা প্রায়ই সত্য হিসেবে দেখা দেয়। মনের সৃষ্ট ছবিগুলো কোনো সত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এইজন্য ইউরোপে যারা মরমিয়া শক্তিধর ব্যক্তি আছেন তারা নিস্তব্ধ দুপুর রাতে ধ্যানে বসেন। কোনো কিছু জানতে চাইলে চোখ বুজে মনকে মস্তিষ্ক- স্নায়ুতে নিষ্ক্রিয় করবার চেষ্টা করেন। ফলে উদ্দীষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুর প্লাজমা তাদের বায়ো-প্লাজমিক বডির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা তা দেখতে পান। দেখবেন মরমিয়া ব্যক্তিরা কোনো কিছু জানতে গেলে চোখ বুজে কি খোঁজ করেন। অর্থাৎ নিজের ব্যক্তিত্বের প্লাজমাগুলোকে দুর্বল করে দেন। এই যে প্লাজমা। এটি কি? বিজ্ঞানে বলা হচ্ছে “In physics plasma is the forth state of matter, streams of masses of ionized particles”।

এই প্লাজমা দৃশ্য ও অদৃশ্য রূপে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র ব্যাপ্ত হয়ে আছে। যেখানে যে ঘটনাই ঘটুক না কেন জগন্মাতার বাইরে তা ঘটেনি। জগন্মাতা একটি কমপ্লিট ইতিহাসের মত। যে পড়ে ফেলেছে অতীতের ঘটনাও সে বলতে পারে, ভবিষ্যতের ঘটনাও বলতে পারে। যা ঘটেছে, ঘটছে, ঘটবে তা মায়ের বাইরের কিছুই নয়। মায়ের অঙ্কের বাইরে গেলে তার হদিশ পাওয়া অসম্ভব। শুধু যেটা জানা দরকার সেটা হল কুলকুণ্ডলিনীর চরিত্র। তার নানা রূপ। জ্যোতিরূপেও তাকে জানা যায় অজ্যোতি রূপেও জানা যায়। এই দুয়ের মধ্যেই অকস্মাৎ আর্শী মহল হবার ক্ষমতা রয়েছে।

 [ সাধক নিগুঢ়ানন্দ এর “লালন ফকিরের আয়না“ (বিজ্ঞানের আলোয় মরমিয়া দর্শনের ব্যাখা) গ্রন্থটি “সাহিত্যম” থেকে ১৪১৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়। উক্ত গ্রন্থ থেকে অবিকল অবিকৃতি রূপে পর্যায়ক্রমিকে পর্ব ভিক্তিক ভক্ত/ অনুরাগী/  পাঠকের নিমিত্তে উপস্থাপন করা হল]

শেয়ার করুন:

অন্যান্য পোস্ট

রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের পাণ্ডুলিপিঃ আবুল আহসান চৌধুরী

বাঙালির লোকধর্ম হিসেবে বাউলের মত ও সাধনার ধারা যথেষ্ট প্রাচীন হলেও গুরুবাদী সংগীতাশ্রয়ী এই মরমি সম্প্রদায়ের সাধকদের রচিত আদি গানের

বিস্তারিত

ফকিরের ঘরের চাবি ডিসি সাবের হাতে – বিধুনন জাঁ সিপাই

#To Tarique Rahman মিস্টার প্রাইম মিনিষ্টার, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছে, দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এটা আনন্দের।   কিন্তু

বিস্তারিত

You cannot copy content of this page

ভিক্ষার ঝুলি

ওয়েবসাইটের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে অনুদান পাঠাতে পারেন।

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫-৫