লালন সাঁই-এর গানের জীবনীঃ প্রথমা পর্ব

রাগ ও তাল সংগীতের অবয়ব। চর্যাপদের মতো; লালনের গানে পদের সূচনায় রাগের উল্লেখ নেই। কিন্তু তালবিভাগের পরিচয় পাই পর্বান্তিক অন্তমিলে, এক দাঁড়ির অর্ধচ্ছেদে, এবং দু- দাঁড়ির পূর্ণচ্ছেদে। কবিতা হিসাবে বিচার করলে পর্ব, এক দাঁড়ির অর্ধ্বচ্ছেদ এবং দু-দাঁড়ির পূর্ণচ্ছেদকে এখানে চিহ্নিত করা যায়।

লালনপন্থী সাধক-গায়ক এবং পদকর্তাদের মতে, লালনের গানের ত্রিখণ্ড। তাঁর গানের সূচনা বা ভূমিকাকে বলা হয় মুখপাত। উদ্ভব। ধরণ। একাধিক পর্বে বা কলিতে গঠিত চরণটি একদাড়ি বা বিসর্গচিহ্ন দিয়ে বিভক্ত হয়। দ্বিতীয় চরণের নাম কোল অন্তরা। প্রথম চরণের অনুরূপ এর গঠন। দু-দাঁড়ি দিয়ে ছেদিতে হয় মুখপাত। সূচনাংশের পরধরণ/ ধরণতরি/কোল ধরণী / আকার এবং আয়তন পরবর্তী ‘কলি’-র চাইতে, তুলনায় ক্ষুদ্রতর হয়ে থাকে। গায়কেরা এ অংশকে অর্ধকলি/ আধকলি হিসাবে গণ্য করে থাকেন। লালন গীতির প্রথম খণ্ডটি বিবৃতিধর্মী, তালমান বহির্ভূত, ‘অনাহত’ আলাপ ।

পদ/ গানের দ্বিতীয় অংশে থাকে কলি/ অন্তরা। বৈষ্ণব ঐতিহ্যে তাল দ্বারা নিয়মিত পদসমূহকে কলা বলা হয় । কলা সমষ্টি দিয়ে রচিত হয় কলি/ কলিকা। কলিকার আয়তনের রকমফের আছে। ছ-প্রকার কলির সন্ধান পাওয়া যায়। কলি হল গানের ছেদযুক্ত অংশ। কবিতার পূর্ণচ্ছেদযুক্ত চরণ, কলির সমতুল্য। প্রবাসীতে (জ্যৈষ্ঠ, ১৩২২) ‘মনের মানুষের’ গানটির সংশোধিত পাঠে রবীন্দ্রনাথ কলি শব্দ ব্যবহার করেছেন, দু-দাঁড়ি দিয়ে কলি বিভাগে গানটিকে বিভক্ত করেছেন। এবং কলিগুলির সূচনায় বামদিকে (১,২,৩,৪) সংখ্যা বসিয়ে কলিগুলিকে সুচিহ্নিত করেছেন। কলি বিভাগ বাউলগানের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য।

অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, ভারতীতে (১৩০২, ভাদ্র), ‘সব লোকে কয়’ গানটি সংখ্যা চিহ্নিত তিনকলিতে বিভক্ত করে প্রকাশ করেছিলেন। কলিগুলি পূর্ণচ্ছেদযুক্ত চরণ সেখানে। ফিকিরচাঁদের প্রকাশিত গানে কলিবিভাগ সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩১৩ সনে প্রকাশিত ‘গোপাল গীতাবলী’ (২ খণ্ড, ১৮ নং নিম্ন গোস্বামীর লেন, কলকাতা)-তে কলিগুলি সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত হয়েছিল। ফিকিরচাঁদের গানে সূচনাংশ কলি-সংখ্যার অন্তর্গত ছিল। এর সম্পাদক ছিলেন জলধর সেন।

গোঁসাই গোপালের গানে, ‘সূচনা’, কলি বিভাগের বাইরে ছিল। অন্তরা/ কলিগুলি সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত হয়েছিল। লালনপন্থী গায়কেরা ‘সূচনাকে’ কলি বিভাগের বাইরে রাখে; কলিগুলির সংখ্যা স্মরণ করে তারা গানটিকে গায়।

গোপালের পদের মতো লালনের অধিকাংশ গান তিন কলির। সূচনাকে গণ্য করে বলা হয় সাড়ে তিন কলির। ‘সাড়ে তিন’ দেহতত্ত্ব এবং সাধনার এক গুরুত্ব পূর্ণ সংখ্যা। মৌখিক গানে কলির সংখ্যা লিখিত হয় না। রবীন্দ্রসদনের রক্ষিত খাতায় / ভোলাই-এর খাতায় কলিবিভাগ আছে। কলি সংখ্যা দ্বারা চিহ্নিত হয়নি। মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, কুষ্ঠিয়ায় বাউল গায়কদের গানের খাতায় কলিবিভাগে গানগুলি লিখিত। পূর্ণচ্ছেদযুক্ত চরণ (কলি) গদ্যের মতো একাধিক পঙ্ক্তিতে স্তবক আকারে লিখিত হয়। ১৩১৩ সনে প্রকাশিত কর্তাভজাদের গান ‘ভাবের গীত’ স্বতন্ত্র স্তবকে কলি বিভাগে বিন্যস্ত হয়েছে। পাঞ্জুশাহের, ‘ছহি ইস্কি ছাদেকী গওহার’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৯০ (১২৯৭) খ্রিস্টাব্দে। সেখানে গানের সূচনার দুটি চরণ একটি স্তবকে। দু-চরণই দু-দাঁড়ির ছেদে এবং পরবর্তী কলিগুলি স্তবকে দু-দাঁড়ির ছেদে সজ্জিত আছে। পাঞ্জুশাহের সন্তান খোন্দকার রফিউদ্দীন, ‘ভাবসংগীত’-এ পাঞ্জু, দুদ্দু, লালন শাহের গানকে পিতৃনির্দেশিত রীতিতে বিন্যস্ত করেছেন। তবে এখানে স্বতন্ত্র স্তবক নির্মাণ নেই। গদ্যের মতো টানা লেখায় দু-দাঁড়ি দিয়ে কলিগুলি ছিন্ন করা হয়েছে মাত্র। এ রীতিটিকে ভোলাই- এর / রবীন্দ্রসদনে রক্ষিত লালনের গানের খাতায় / গোঁসাই গোপালের গানে চিহ্নিত করা যায়। লালনের আখড়া নিবাসী ফকির আনোয়ার হোসেন (মন্টু শাহ) দু-দাঁড়ির কলিবিভাগ মান্য করেছেন। কিন্তু কলির অন্তর্গত পর্ব বা কলাগুলি কবিতার চরণের / পঙ্ক্তির মতো স্বতন্ত্রভাবে লিখেছেন।

উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লালন গীতিকা’ এবং অন্যান্য গবেষকেরা কলিগুলিকে ভেঙে কবিতার পঙ্ক্তির আকারে সাজানোয় নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। লালনে পর্বান্তিক অন্তমিল থাকে। আবার কখনো কখনো তিনি অমিল দিয়ে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেন। ব্যতিক্রমহীনভাবে লালনের কলি বিভাগগুলির মধ্যে থাকে অন্তমিল। সে অন্তমিলের বহু বৈচিত্র্য। শিষ্ট গবেষকগণ কলিকে কমা, সেমিকোলন দিয়ে যে সমস্ত অর্থবিভাগ করেছেন ; বা পর্বান্তিক মিল দিয়ে যেভাবে ছিন্ন করেছেন তাতে বহুক্ষেত্রে অর্থবোধ বা ছন্দরূপ ব্যাহত হয়।

লালনের পদাবলীর সমাপ্তি অংশে থাকে কবীর, মীরা, বৈষ্ণব মহাজনদের ভনিতার মতো নিজের নাম এবং নিজস্ব মত, মন্তব্য। হাসন রজার পদে, ভাবের গীতে লালশশির পদে, গোঁসাই গোপালের পদে ; বহু বাউল গানে কেবল পদকর্তার নাম আছে। লালনের (এবং পাঞ্জুর) বিপুল সংখ্যক গানে উপরন্তু গুরুর নাম স্মরিত হয়েছে। লালনোত্তর কালে দুদ্দু ইত্যাদির পদে গুরুর নামোল্লেখ এক অনিবার্য রীতি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। পদের শেষাংশে নিজেকে সাঁই, দরবেশ বলে লালন পরিচয় দেননি। দীনতাবাচক ফকির ও অথবা অধীন; এবং ভৎর্সনা বা আত্মনিন্দাসূচক শব্দ ব্যবহারে সাধকসুলভ বিনয়ে লালন অতুলনীয়। তাঁর পদের অন্তিমে বক্রোক্তিমূলক পরোক্ষ-বাকের কবিত্ব তুলনাহীন এবং অনুকরণের অযোগ্য। তিনি আত্মপ্রচার আত্মঘোষণা করেন না; ব্যক্তিগত অক্ষমতা, অযোগ্যতাকে তুলে ধরেন। সাধনার দুরূহতা প্রতিপন্ন করেন নিজের অযোগ্যতার কথা বলে। সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন গুরু, মহাজনের নামে। লালনের সূচনা এবং সমাপ্তি অনন্য; এক স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম। লালনের গানে ধরণ, পরধরণ এবং কলিগুলি অন্তমিল দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়। সাধারণত লালনের গান তিনকলির (অর্ধকলি সহ সাড়ে তিন কলি) এবং পাঁচটি মিত্রাক্ষরে বদ্ধ । তবে খুব কম হলেও, চার বা পাঁচকলির গানও রচেছিলেন লালন। ততোধিক কলির গান ‘ভাবের গীতে এবং অন্য পদকর্তাদের আছে, কিন্তু অধিকতর কলির গানগুলি লালনের কিনা সন্দেহযোগ্য। ভারতীয় মার্গসংগীতের ত্রিখণ্ড – আলাপ, স্থায়ী, অন্তরা। লালনগীতির সূচনা ‘অনাহত’ আলাপ ; কলিগুলি অন্তরা ;লয়-তালে বদ্ধ। কিন্তু এ গানে ‘স্থায়ী’ স্পষ্ট নয়। গায়কেরা ইচ্ছানুসারে কলিগুলিকে পুনরাবৃত্ত করে। পদ্মা-ভাগীরথীর বদ্বীপে লালনের গানের সুর সমাপ্তিতে ‘চালান’ অর্থাৎ দ্রুত চালে চরমে উঠে সমাপ্ত হয়। দেহসাধনার কোনো অজ্ঞাত পদ্ধতির সঙ্গে এর সংযোগ থাকা অসম্ভব নয়।

লালনের সূচনার দৈর্ঘ এবং পর্বসংখ্যা পরবর্তী পূর্ণ কলিগুলি অপেক্ষা কম। ভোলাই-এর খাতায় ছেদ এবং কলিবিভাগের চিহ্ন হিসাবে স্বল্পচ্ছেদে: (বিসর্গ), অর্ধচ্ছেদে এক দাঁড়ি এবং পূর্ণচ্ছেদে দু-দাঁড়ি পাওয়া যায়। পরবর্তী গানে অর্ধচ্ছেদে এক দাঁড়ি এবং পূর্ণচ্ছেদে দু-দাঁড়ি ব্যবহৃত হয়েছে। লালনপন্থী গায়কেরা মুখপাত এবং কোল অন্তরার কথা মনে রাখেন, তারপর সুরে তালে কলিগুলির সংখ্যা স্মরণে রেখে গান করেন। উচ্চারণ বিকৃত হয়, হেরফের হয় দু-একটি শব্দের। কিন্তু দীর্ঘ হয় না মুখপাত-কোল অন্তরা; বর্জিত হয় না কলি; ভনিতায় বাদ যায় না লালনের নাম। সামান্য পরিবর্তন সত্ত্বেও, এ সমস্ত গানের মূল কাঠামোটি অপরিবর্তিত থাকে বলে, রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য সঠিক। তুলনায় বাউল মহাজনের পদ কম পরিবর্তিত হয় বলে আশুতোষ ভট্টাচার্য মনে করেছেন। কিন্তু অসাধক, ভিন্নবৃত্তের গায়ক নানাবিধ উদ্দেশ্যে লালনের জনপ্রিয়তার সুযোগ নেয় এবং জাল গান রচনা করে গায়। লালনকে ইসলামি সমাজভুক্ত প্রতিপন্ন করার জন্য দুদ্দ শা-র নামাঙ্কিত জাল পুঁথি চালু করা ছাড়াও পাকিস্তানি ধর্মান্ধ গবেষকদের কেউ কেউ বিকৃত শব্দ যুক্ত করেছে লালনের পদে। লালনের নামে নিজের রচনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অনেকে চেষ্টা করেন। রাঢ়ের প্রখ্যাত গায়কদের অনেকে বিভিন্ন পদ ভেঙে একটি পদ রচনা করে, লালনের ভনিতা দিয়ে দেন। লালনপন্থী কোনো কেন্দ্র বা কর্তৃত্ব না থাকায় এবং প্রামাণ্য মুদ্রিত লালনের গ্রন্থাভাবে লালনের পদ পরিবেশনের দাবিতে চতুর গায়ক যে কোনো গানে লালনের ভনিতা দিয়ে দেন। কদমখালির (নদিয়া) লালন উৎসবে প্রতিবছরই এ রকম ঘটনা ঘটে।

সমস্যা গুরুতর হয় তখন, যখন প্রখ্যাত কোনো গবেষক বা গায়ক অথবা সংগঠন লালনের জাল গানকে স্বীকৃতি দেন। সরোজকুমার রায় চৌধুরীর উপন্যাস ত্রয়ী (ময়ূরাক্ষী-গৃহকপোতী- সোমলতা) প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৫-১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে। সেখানে চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করব কি’ গানটি মদন সা ফকিরের নামে উল্লিখিত এবং সংগৃহীত হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত এক গায়ক গানটিকে লালনগীতি হিসাবে রেকর্ড করেন এবং ১৯৫০- এর পরে এ গানটি বেশ জনপ্রিয় হয়। বহু ছাপানো বইয়ে গানটি লালনের নামে চিহ্নিত হয়েছে। সচকিত হয়ে উঠি যখন লালনপন্থী মন্টু শা-এর গ্রন্থে (৯৫ নং পদ) গানটি স্থান পায়। এ পদটির উত্তরমূলক একটি পদও লালনের নামে এ গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে (পদ নং ৯৬)। সুকুমার সরকারেও অনুরূপ ঘটনা পাই। কিছুদিন আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রকাশিত লালনের গানের ক্যাসেটে জনৈক শিল্পী, ‘বলি আয় রে মুসলিম যাইরে মসজিদ সাঝেরও বেলায়’ গানটি লালনগীতি হিসাবে গেয়েছেন। এটি বাংলাদেশের বহু প্রচলিত ‘ইমাম যাত্রা’-র গান। ‘মসজিদকে খোদার ঘর’ বলে কেবলমাত্র মুসলমানকে ‘নামাজে’ আহ্বান লালন করতে পারেন কি? উক্ত পদে হাসানের সমস্যাগুলিকে সাধক লালন কেন গুরুত্ব দেবেন, অনেকে ভাবলেন না। আমাদের মৌখিক আপত্তিতে ‘লোকসংস্কৃতি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কেন্দ্র’ গানটিকে বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু ইতিমধ্যে কদমখালির লালন উৎসব কমিটির সম্পাদক সুকুমার সরকার প্রকাশ করেছেন লালনের গানের এক সংকলন। দু-বঙ্গের জীবিত, মৃত অনেক গায়কের নাম আছে তার গ্রন্থে ৷ আলোচ্য গানটির কোনো তথ্যসূত্র নেই; নেই সরকারি গানের ক্যাসেটের উল্লেখ। কদমখালির মেলা এবং উৎসবের সঙ্গে আমি, সুধীর চক্রবর্তী, এবং বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যুক্ত। কিন্তু গানের সংকলনটি আমাদের অজ্ঞাতে প্রকাশিত হয়েছে। উক্ত উৎসব এবং মেলা কমিটির স্মারক পত্রে আরেকটি বিভ্রান্তিকর লালনগীতি প্রকাশিত হয়েছিল।

“এমন সমাজ কবে গো সুজন হবে

যেদিন হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান জাতি গোত্র নাহি রবে।“

এখান থেকে তৃপ্তি ব্রহ্ম গানটি নিয়েছিলেন? না তৃপ্তি ব্রহ্মের, ‘লালনের মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি’ (লালন মৃত্যুশতবার্ষিকী স্মারক গ্রন্থ, পৃ. ১৫৭-১৫৮) নিবন্ধ থেকে গানটি গৃহীত হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তবে কেউ গানটি সংগ্রহের ব্যক্তি, স্থান বা সময়ের উল্লেখ করেননি। প্রাক ১৯৪৭-এর কোনো সংগ্রহ গ্রন্থে গানটি নেই।

গানটি সাড়ে ৩/৪ কলির। কলির মধ্যে মিত্রাক্ষর আছে। কিন্তু অন্তপর্বিক মিত্রাক্ষর প্রতিক্ষেত্রেই অত্যধিক। ‘কবে গো’, ‘তুলবে না গো’ শব্দাংশ লালনে বেশি নেই। বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আতরাফ, আশরাফ শব্দের ব্যবহার লালনে পাওয়া যায় না। ‘সবার পাওনা পাবে সবাই’ (each ac- cording to need) তো, সমাজতান্ত্রিকতার বাক্যাংশের অনুবাদ বলে মনে হয়। গানটি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাপ্রসূত বলে, আধুনিক কালের কারো রচিত হতে পারে। উক্ত নিবন্ধে তৃপ্তি ব্রহ্ম লালনের ভাষা চেতনার এক গান পরিবেশন করেছেন। ‘কি কালাম পাঠালেন আমার সাঁই দয়াময়’ এবং ‘বিনা কাজে ধন উপার্জন’ গানদুটির ভাষাচেতনার সঙ্গে তুলনা করলে এ গানটিকে ‘আধুনিক’ বলতেই হবে। গানটিতে কলির মিত্রাক্ষরে ভ্রান্তি আছে। আরবি, ফারসি, ইংরাজি ভাষার উল্লেখ আছে গানে। ‘মনের ভাব প্রকাশিতে ভাষার উদয় এ জগতে’ এ বাক্যাংশে মনাতীত, অনামক, বাগীন্দ্রিয় প্রভৃতি শব্দ কি লালনের ? প্রত্যেক বড়ো কবির শব্দ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা থাকে ; থাকে বাকভঙ্গির বৈশিষ্ট্য। সেগুলি এ গানে রক্ষিত হয়নি। মন্টু শা ‘এমন সমাজ’ গানটিকে তার বইয়ের ভূমিকায় আলোচনা করেছেন। ওয়াকিল আহমদ, বাউল রবীন্দ্রনাথ গানে, তৃপ্তি ব্ৰহ্ম আলোচিত পদ দুটিকে গ্রহণ করেছেন, এটি পরিতাপের বিষয়। ‘হারামনির’ ভূমিকায়, বাউল গানের অকৃত্রিম বিশিষ্টতার কথা বলে, তা জাল করা যায় না এবং অনুকরণ করা কঠিন বলে মন্তব্য করেছেন। বাউল চর্যা, সাধনা এবং জীবনযাপন পদ্ধতির সঙ্গে বাউলগান যুক্ত ছিল। উৎপাদন ব্যবস্থার অভিঘাতে, শ্রম বিভাজনে ; বাউলগান অর্থনৈতিক মূল্য অর্জন করায় – ক্রমশ তা সাধক গোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। বাদ্যযন্ত্র নির্মাণ, বাদ্যকর, পদরচনা এবং সুরারোপ থেকে গায়কের বৃত্তি ও ভূমিকা, পৃথক হয়েছে। অধিকাংশ জনপ্রিয় গায়ক দুষ্কর বাউল সাধনার সঙ্গে যুক্ত নয়। ১৮৮০ নাগাদ ত্রিশটির বেশি বাউল গানের গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন অসাধক, ‘সকের/ শখের বাউল’। অক্ষয়কুমার মৈত্র, জলধর সেন এ সমস্ত ‘সাজা বাউলদের’ কথা লিখেছেন। এদের অতুল জনপ্রিয়তায় ম্লান হয়ে গিয়েছিলেন,

“কোথা আর পাগলা কানাই লালন গোঁসাই

সব সাঁই এতে হার মেনেছে”

লালন নিজে বিষয়টি নিয়ে গান লিখেছেন, ‘আজগোবী বৈরাগ্য লীলা দেখতে পাই। সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক লাভ, সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক স্বার্থ, দেশে বিদেশে বাউল গানের চাহিদায় প্রকৃত সাধকেরা তাদের প্রাকৃতগান নিয়ে এখন লোক সমাজের গভীরে অজ্ঞাতবাসে চলে গেছেন। মেলা, লোকউৎসব, বাউল সম্মেলনে কোটিকে গুটিক সাধক বাউলের দেখা মেলে। এ পটভূমিকায় অনিবার্যভাবেই লালনের জনপ্রিয়তা হেতু তার নামে অন্য সাধক পদকর্তার গান, স্বরচিত গান এবং জাল-ভেজালগান চালানো শুরু হয়েছে। গবেষক রাহুল পিটার দাস লিখেছেন, ‘The commercialization of Baul songs has resulted in a mightly industry, … which spins out fake Baul songs writ- ten and set to tunes by professional artists or their hacks’ কিন্তু গবেষকগণ নানা কল্পিত পুরাণ, গান লালনে সচেতনভাবেই আরোপ করে, সমস্যাটিকে জটিলতর করে তুলেছেন।

নদিয়ার নবদ্বীপ থানার, ২১ নং মৌজার, চরব্রহ্মনগরের গৃহী বৈষ্ণব রামচন্দ্র মণ্ডলের নাম যুক্ত করা হয়েছিল দুদ্দু শাহের, লালন জীবনীর সঙ্গে। ১৯৬৭-এ ঢাকার ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় এটি প্রকাশিত হয়। লালন-গবেষক মুহম্মদ আবু তালিব, এস.এম.লুৎফর রহমান, খোন্দকার রিয়াজুল হক প্রমুখ এ জীবনীকে ‘সত্যমূলক’ বলে ঘোষণা করেন। এটি সর্বাংশে জাল বলে এখন স্বীকৃত হয়েছে। ইতিপূর্বে পশ্চিমবঙ্গে প্রচারিত সরকারি ক্যাসেট, বিখ্যাত গায়ক এবং লালনমেলার সন্দেহযোগ্য গান কৌশলে বাংলাদেশে স্বীকৃত হয়ে, পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠায় উদ্যত হয়েছে। ভৌগোলিক স্থানান্তরের এ কৌশল রবীন্দ্রনাথের অজ্ঞাত, রাহুল পিটার দাসেরও অকল্পনীয়। হিন্দু সাধক, অসাম্প্রদায়িক সরকার এবং সংগঠনকে জড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে লালনের খাঁটি গান নির্মাণের প্রচেষ্টায়।

লালন লিখতে জানতেন কিনা তা বিতর্কিত। তাঁর নিজের হাতের লেখা গান পাওয়া যায়নি। তাঁর আখড়ার, দত্তকপুত্র ভোলাই-এর গানের খাতা আমরা পেয়েছি। তাঁর গানের অজ্ঞাত লেখকের কপি করা অন্য গানের খাতা শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-ভবনে সংরক্ষিত আছে। দ্বিতীয় খাতাটির গানগুলি, সনৎ মিত্র, ‘লালনফকির কবি ও কাব্য’ নামে মুদ্রিত করেছেন (পুস্তক বিপণি, কলকাতা,১৩৮৬)। মিত্র, এখানকার ২৮৫টি গানকেই লালনের খাঁটি গান হিসাবে গণ্য করে, এর বাইরেকার সমস্ত লালনের নামে প্রচারিত গানকে ভেজাল বলেছেন। সনৎ মিত্র এ গানগুলির লেখক, মালিক নির্ণয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি। প্রবাসীতে রবীন্দ্রনাথ যে কুড়িটি লালনের গান প্রকাশ করেছিলেন, তার সবগুলি এখানে নেই। ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’ এ বিখ্যাত লালনগীতি, মিত্রের সংগ্রহে ছিল না। আবুল আহসান চৌধুরীর প্রেরিত এবং মকছেদ সাঁই কৃত স্বরলিপি তিনি কিন্তু ছাপিয়েছেন। লালনের বহু গান এখানে নেই। ভোলাই-এর খাতার সঙ্গে এর গানের তারতম্য আছে সংখ্যায় এবং রূপরীতিতে। ভোলাই-এর খাতা এবং রবীন্দ্রভবনের খাতায় অবশ্য জাল গান নেই। কিন্তু লালনের বহু গান এর বাইরে থেকে গেছে। হিতকরীর নিবন্ধে লালনের ‘অসংখ্য গানের’ উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রবাসীর ‘হারামনি’-তে লালনের গানের সংগ্রাহক সতীশচন্দ্র দাস এবং করুণাময় গোস্বামী লালনের সহস্রগানের কথা বলেছেন।  মনসুউদ্দীন লালনের গানের মুদ্রিত বই বা নির্ভরশীল পাণ্ডুলিপি পাননি। লালনের গানের সংখ্যার সঠিক তথ্যেরও তিনি অভাববোধ করেছেন।

 

পাঞ্জু, গোঁসাই গোপাল, লালশশি ইত্যাদির পদ মুদ্রিত হয়েছিল। কিন্তু লালনাদির পদ তাদের জীবিতকালে ছাপার অক্ষরে গ্রন্থকারে প্রকাশ হয়নি। লালনের শিষ্যদের অনেকে লিখতে জানতেন, তাদের হস্তলিখিত খাতায় বেশকিছু গান রক্ষিত হয়েছিল। যদিও ছেউরিয়ার আখড়ায় বা লালন পরিজনদের কাছে লালনের গানের প্রামাণ্য কোনো খাতা/ পুঁথি পাওয়া যায়নি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং পুরোনো বাউল গানের খাতার কথা বলেছেন। চিত্তরঞ্জন দেব লিখেছেন যে লালনের গান সংগ্রহে রবীন্দ্রনাথ বিস্তর অসুবিধা বোধ করেছিলেন। লালনুসারীদের গান লিখে দিতে বললে তারা যে গানগুলি লিখে দেয় When they did venture to attempt it, I found it almost impossible to decipher their writing the spelling and lettering so outrageously unconventional রবীন্দ্রসদনে রক্ষিত খাতা অথবা ভোলাই-এর খাতা সম্পর্কে এ মন্তব্য অসমীচীন নয়। সমস্ত হস্তলিখিত পুঁথিতে পাঠের এ সমস্যা আছে। ১৩১৬-তে বঙ্গদর্শনে নিবন্ধ রচনার সূত্রে সুবোধচন্দ্র মজুমদার ছেউড়িয়া আশ্রমে রক্ষিত খাতার সাহায্য নিয়েছিলেন। উত্তরকালে মতিলাল দাস আখড়ার খাতা সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর থেকেই লালনপন্থীদের কাছে লালনের গানের খাতা পাওয়া যায় না। বরং রবীন্দ্রনাথ এবং মতিলাল দাসের বিরুদ্ধে তাঁদের খাতা নিয়ে ফেরৎ না দেওয়ার অভিযোগ শোনা যায়। মতিলাল দাসের সংগৃহীত খাতার সাহায্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লালন গীতিকা’ (১৯৫৮) সংকলিত হয়। রবীন্দ্রসদনে রক্ষিত খাতাও এতে ব্যবহৃত হয়েছিল। এরপর জসিমুদ্দিন, হারামনিতে মনসুরউদ্দিন এবং উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লালনের গান সংগ্রহ করেন। এ সংগ্রাহকেরা মূলত গায়কদের শোনা গানকে লিখিত রূপ দেন। উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, মনসুরউদ্দিনের সংগ্রহকে অবৈজ্ঞানিক বলেছেন। ওয়াকিল আহমদ এ সংগ্রহকে ত্রুটিপূর্ণ বলে ; উপেন্দ্রনাথের সংগ্রহে, সংগ্রাহকের হস্তক্ষেপ চিহ্নিত করেছেন, তুলনায় সরলা দেবী থেকে প্রবাসীর সংগ্রহ ছিল অনেক বস্তুনিষ্ঠ। ১৯৪৭-এর পরে ইসলামি এবং হিন্দুত্ববাদীরা লালনকে তাদের দলভুক্ত করার জন্য যথেচ্ছভাবে লালনের নামে গান বানায়, গানের শব্দ পরিবর্তন করে। লালনের রচিত নয় এমন গান, লালনে আরোপ করে। সাধন সংক্রান্ত শব্দ বিকৃত/ বর্জিত হয়ে যায় ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগের অভাবে। বাউল গানের চাহিদা এবং মর্যাদার পথ ধরে প্রাদুর্ভূত হয় ‘কৃত্রিম নকলের প্রচুরতা’। লালনের অতুল জনপ্রিয়তার সূত্রে এবং যথাযথ বিজ্ঞানসম্মত সংগ্রহের অভাবে লালনগীতির মধ্যে জাল, ভেজাল গানের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। মৌখিক, অসংগৃহীত গানের ক্ষেত্রে এ সম্ভাবনা থাকে। উপেন্দ্রনাথের সংগ্রহে তাঁর মার্জনা এবং ইসলামি ঐতিহ্যে অনবধানতার ফলে কিছু বিকৃতি ঘটেছে। এ বিকৃতি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘লালন গীতিকায়’ ঘটেছে। গ্রাম্যশব্দ, বৈষ্ণব বা সুফি ভাবিত সাধনসংক্রান্ত শব্দে ভ্রান্তি ঘটেছে বেশি। কিন্তু মনসুরউদ্দিনের সংগ্রহে অংশত সাম্প্রদায়িক বোধ বিকৃতি ঘটিয়েছে।

লালনগীতিকা (১৯৫৮), অন্নদাশঙ্করের ‘লালন ও তাঁর গান’ উপেন্দ্রনাথের গ্রন্থ, (১৩৮৫) ব্যতীত কোনো গুরুত্বপূর্ণ লালনগীতিকার সঙ্কলন উত্তর স্বাধীনতা পর্বে পশ্চিমবঙ্গে হয়নি। ভোলাই-এর খাতা এবং রবীন্দ্রসদনের রক্ষিত খাতার মুদ্রণ তো সাম্প্রতিক ঘটনা। পূর্ব-পাকিস্তান এবং বাংলা দেশে ১৯৪৭-এর পরে লালনের গানের বহু সংকলন হয়েছে। অনেক নতুন গান, লালনের জীবনকথা এগুলি তুলে ধরেছে। এ সমস্ত গ্রন্থে সংগ্রাহকেরা পূর্ববর্তী সংগ্রহকে সমালোচনা করেছেন ; কিন্তু প্রাক্তন সংগ্রহের বড়ো অংশকে ব্যবহার করেছেন। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের বাইরের সংগ্রহের বহু অ-লালনীয় গান নিয়ে গবেষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। সংগ্রাহকেরা কেউই নিজস্ব সংগৃহীত লালনগীতির নিঃসংশয় তথ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেননি । ওয়াকিল আহমেদ ১৯৪৭-এর পূর্ববর্তী লালনের গানের সংকলনকে বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে গ্রহণ করার যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা সমর্থনযোগ্য। কাঙালের রচনায়, হিতকরীতে, সরলাদেবী, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, প্রবাসীতে যে গানগুলি প্রকাশিত হয়েছিল; রবীন্দ্রসদনে রক্ষিত গান এবং ভোলাই-এর খাতার গানগুলিকে লালন গীতির প্রামাণ্য পাঠ হিসাবে গ্রহণ করেছি আমরা। আহমেদ এগুলিকে আদি পাঠ (archetype) হিসাবে গণ্য করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এ সমস্ত গানের লেখ্য/ মুদ্রিত রূপে ভাষাগত বিপুল পার্থক্য আছে। আছে গানের পঙ্ক্তি, স্তবক নির্মাণের পার্থক্য। মৌখিকগানের ভাষারূপের বিবর্তন, দেশে এবং কালে অনিবার্য হয়ে ওঠে। আদি পাঠ হিসাবে আমরা ভোলাই-এর সংগ্রহাদিকেই মেনেছি। উপেন্দ্রনাথের, মনসুরউদ্দিনের (প্রথম পর্বের সংগ্রহ), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন গীতিকা, রফিউদ্দিনের ‘ভাবসংগীত (১৯৫৫), অংশত মন্টুশাহের, ‘লালন সংগীত’ (১৯৯৩) এবং পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহের লালনপন্থী, যেগুলিতে সচেতন উদ্দেশ্যমূলকতায় জাল গান অন্তর্ভুক্ত হয়নি ; পূর্বোক্ত গানের পাঠান্তরগুলি (aiktype) সেখান থেকে চিহ্নিত করতে হবে।

ওয়াকিল আহমেদ বিভিন্ন সংগ্রাহকের মুদ্রিত পাঠান্তরগুলিকে উল্লেখ করেছেন। ৬৪০টি গানকেই তিনি লালন- সমগ্র বিবেচনা করেছেন। গ্রহণ-বর্জনের নীতিকে তিনি স্পষ্ট করে বলেননি। গানের পর্যায়ের নাম দিয়েছেন তিনি। স্তবক-চরণে আধুনিক রীতি অনুসরণ করেছেন।

দু-দাঁড়ির পূর্ণচ্ছেদ দিয়ে, গদ্যের মতো লিখিত রূপে শিষ্ট গবেষকদের কেউই লালন গানকে মুদ্রিত করেননি। তারা নিজস্ব, আধুনিক রীতিতে কমা, সেমিকোলন, দাঁড়ি দিয়ে এবং পঙ্ক্তি বিন্যাস ও স্তবক গঠন করে লালনের গানের বর্হিরূপের রদবদল ঘটিয়েছেন। এ ভঙ্গির অন্যতম প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ। প্রবাসীতে লালনের গানগুলি তিনি সম্পাদনা করে আধুনিক সজ্জায় প্রকাশ করেছেন। মনসুরউদ্দিনের সংগ্রহ-গান সম্পাদনা করেছেন আবদুল হাই। তিনি কমা, সেমিকোলন, ড্যাস, এক দাঁড়ি, দু-দাঁড়ি সবই ব্যবহার করেছেন। পূর্ণচ্ছেদ যুক্ত স্তবক এখানে সাতটি পর্যন্ত আছে। এক দাঁড়ি, দু দাঁড়ি দিয়ে গদ্যের মতো টানা লেখার রীতি বঙ্গের পুঁথি সাহিত্যে দেখা যায়। বৈষ্ণব আখড়ায় রক্ষিত গুপ্ত পুঁথির লেখার ঐতিহ্য, বাউল গানের হস্তলিখিত খাতায় পাওয়া যায়। তারপর আধুনিক শিক্ষা-রীতির গদ্য/ পদ্য লেখার বিশিষ্ট রীতি একে লুপ্ত করে দিয়েছে। বাউলগানের প্রথম যুগের মুদ্রণে ফিকিরচাঁদ, গোঁসাই গোপাল, লালশশীর ‘ভাবের গীতে প্রাচীন ঐতিহ্যকে চিহ্নিত করা যায়।

বাংলার দেশি-গানের আলোচনা পাই নরহরির গ্রন্থে। সার্থক পদের অবয়বের গানকে তিনি বলেছেন ‘নিবদ্ধসংগীত’। দুজন গায়কের উক্তি প্রত্যুক্তিমূলক গানকে তিনি ‘যমল’ বলেছেন। ‘কলা’ হচ্ছে এ সমস্ত গানের তালের (বিভাগের) অংশ। কলির সংখ্যা কম বা বেশির উপর নির্ভর করে গানের আয়তন। লালনের প্রাচীন খাতায় প্রাপ্ত অধিকাংশ পদ তিনকলির। তাঁর চারকলির বা তদুর্ধ্ব পদের সংখ্যা খুব কম। তার কলিগুলি মিত্রাক্ষর দিয়ে সমাপ্ত, অসমপদীকলিতে থাকে অন্তপর্বিক মিত্রাক্ষর। ফিকিরচাঁদের, লাল শশীর, হাউড়ের, লালনের গান, যারা সাধন-জগত-সম্পৃক্ত, প্রকাশ করেছেন, তারা কলি বিভাগ মান করে, এক দাঁড়িতে অর্ধ্বচ্ছেদ এবং দু-দাঁড়িতে পূর্ণচ্ছেদে কলি সমাপ্ত করেছেন। অসাধক বুদ্ধিজীবী সংগ্রাহক সম্পাদকেরা ছেদ, কমা, চরণ, স্তবক বিভাগ অনুসরণ করেছেন। লালনের মিত্রাক্ষর ব্যবহারের বৈচিত্র্য আছে। মিত্রাক্ষরের সমান্তরতা তিনি অমিত্রাক্ষর দিয়ে ভেঙে দেন। ভঙ্গি গড়ে ওঠে এবং ভেঙে যায় তাঁর গানে।

হিতকরী, সরলাদেবী, ভোলাই-এর খাতা এবং সর্বজনস্বীকৃত লালনের গানগুলি থেকে একটি বহিরঙ্গ, আরেকটি অন্তরঙ্গ কাঠামোর পরিচয় পাওয়া যায়। পাওয়া যায় বিশিষ্ট বাকভঙ্গি এবং রূপরীতির পরিচয়। এগুলি অবশ্য অনুকরণের অতীত নয়। কিন্তু লালনের মূল জীবন প্রত্যয়টি এক মৌলিকতার পরিচয়বাহী। জাত-পাত-বর্ণ-লিঙ্গ-সম্প্রদায় ভেদের বিরুদ্ধে, অচল আচার, অনড় শাস্ত্র এবং দেয়ালবন্দী ধর্মের বিরুদ্ধে তিনি অবিরল প্রতিবাদ করেছেন। এ সমস্ত বিষয়ের সমর্থনে যখন কেউ লালনের গান আবিষ্কার করেন, তখন সেগুলি প্রত্যাখ্যান করা অনিবার্য হয়ে ওঠে।

লালনের সঠিক গান এবং সেগুলির শুদ্ধ পাঠ নির্ণয় এক জরুরি কিন্তু জটিল বিষয়। একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে এ দায় দুর্বহ। এ জন্য এক বিশেষজ্ঞের সমিতি গঠন করা প্রয়োজন। দু-বঙ্গের বিশেষজ্ঞরা এ দায় বহন করলে ভালো হয়। লালন বঙ্গের এবং লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধনের সেতু। রাজনৈতিক সীমারেখা তাকে খন্ডন করেনি।

(*** গবেষক “শক্তিনাথ ঝাঁ এর “লালন সাঁই-এর গান” “কবিতা পাক্ষিক” থেকে প্রকাশিত গ্রন্থের ভূমিকাংশ পর্বাকারে ভক্ত/অনুরাগী/পাঠকের নিমিত্তে উপস্থাপন করা হল)

শেয়ার করুন:

অন্যান্য পোস্ট

কাঙাল হরিনাথের লালন সাঁই ফকির

ম. মনিরুজ্জামান   অখণ্ড বাংলাদেশে উনিশ শতকে সংবাদ-সাময়িকীপত্র পরিচালনা করে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-৯৬)। তিনি থাকতেন কুমারখালীতে।

বিস্তারিত

ফকিরের আখড়া থেকে লালনের মাজারঃ বিবর্তন নাকি দখল ?

ফকির লালন সাঁইকে, তাঁর আঁখড়াবাড়ি নিষ্কর (কর মওকুফ) ঘোষণা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তৎকালীন শিলাইদহের কুঠিবাড়ির দায়িত্বে থাকা জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুর। কুষ্টিয়ার

বিস্তারিত

You cannot copy content of this page

ভিক্ষার ঝুলি

ওয়েবসাইটের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে অনুদান পাঠাতে পারেন।

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫-৫