— ডক্টর ক্যারল সলোমন
আমি যখন বাউল সম্প্রদায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি লালন ফকিরের গান ইংরেজিতে অনুবাদের সিদ্ধান্ত নিয়েছি তখন দেখেছি যে প্রকৃত অনুবাদের কাজ শুরু করার পূর্বে অনুবাদককে অন্তত তিনটি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়:
১. গানের প্রামাণিকতা বিচার
২. গানের পাঠোদ্ধার
৩.গানের অর্থবিশ্লেষণ
১. গানের প্রামাণিকতা বিচার
লালনের ভণিতাসহ অনেক গান আছে যেগুলো লালনের নয় । এক্ষেত্রে গানটির মর্যাদা বৃদ্ধির জন্যেই লালনের নাম আরোপিত হয়েছে। এই কারণে আমি সে সমস্ত গান নির্বাচন করেছি তার প্রামাণিকতা সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন ওঠার অবকাশ নেই । এর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ সংগৃহীত দুটি খাতায় অন্তর্ভুক্ত গান (*১*) এবং মতিলাল দাস ও পীযূষকান্তি মহাপাত্রের ‘লালনগীতিকা’ (১৯৫৮) শীর্ষক সংগ্রহের অন্তর্গত অতিরিক্ত ১৬৪ টি গান । উক্ত খাতা দুটি লালনের গানের প্রাচীনতম পান্ডুলিপি কিংবা তার কাছাকাছি বলে বিবেচিত হয়। উপরন্তু গবেষকদের মতে এই খাতাদ্বয় লালনের গানের আসল খাতা । ‘লালন গীতিকা’য় যে সমস্ত গান আছে সেগুলো শ্রীদাস এই শতকের তিরিশের দশকে লালনের আখড়ায় রক্ষিত একটি খাতা থেকে নকল করে নিয়েছিলেন । এই গানের খাতাটি পরে আখড়া থেকে হারিয়ে গিয়েছিল । এর বাইরে লালনপন্থী ফকিররা যে সমস্ত গান নিয়মিত গেয়ে থাকেন সামান্য ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে সেগুলোকে আমি আসল গান হিসেবে বিবেচনা করেছি ।
২. গানের পঠোদ্ধার
লালনের গানের যে সব সংকলন প্রকাশিত হয়েছে সেগুলোর উপর আমি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করতে পারিনি, কারণ এগুলো দুর্বলভাবে সম্পাদিত এবং ভুলে পরিপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রে পাঠ কোনও অর্থবহন করে না এবং এ সব পাঠ স্পষ্টত বিকৃত। অন্যান্য ক্ষেত্রে আমি দেখেছি যে ভুলভ্রান্তি সহজে লক্ষ্যযোগ্য নয় । আমি বুঝতেও পেরেছি যে সরাসরি পরিবেশনা থেকে আমি যে সব গান টেপ রেকর্ডারে তুলে নিয়েছি তার উপরও পুরোপুরিভাবে নির্ভর করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে শিল্পীরাও আমাকে এ ব্যাপারে সাবধান করে দিয়েছেন । কারণ গান গাইবার সময় যখন তাঁরা গানের কোনও অংশ ভুলে যান তখন যেভাবে পারেন সে ফাঁকটুকু পূরণ করে নেন।
এ সব কারণে আমার মনে হয় লালনের গানের প্রামাণিক এবং নির্ভরযোগ্য সংস্করণ যতদিন না প্রকাশিত হয় ততদিন সঠিক পাঠ নির্ধারণের জন্যে উত্তম পন্থা হলো, লালনগীতির মূল উৎসভূমি যশোহর এবং কুষ্টিয়ার লালনপন্থী প্রবীণ ফকিরদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যত দূর সম্ভব প্রতিটি গানের নির্ভুল পাঠ নির্ণয় করা। এই পদ্ধতি সবসময় অনুসরণ করা সহজ নয়, কারণ বাউল ফকিররা সাধারণত নিজের আস্তানায় একনাগাড়ে বেশিদিন থাকেন না। তাঁরা বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়ান । সে জন্যে এক জায়গায় ধরে বসিয়ে তাঁদের সঙ্গে ধীরে সুস্থে আলাপ-আলোচনা করে গবেষণার উপাদান বের করে আনা কঠিন হয়ে পড়ে।
আমার ভাগ্যই বলতে হবে যে, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশে লালনগীতির অন্যতম প্রধান শিল্পী ও তত্ত্বজ্ঞ খোদা বক্স বিশ্বাসকে আমি ঢাকা শিল্পকলা একাডেমীতে তিন মাসের জন্যে পাই । তখন তিনি ঐ একাডেমীতে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছিলেন । ওই তিন মাসে প্রায় প্রতিদিন তাঁর সঙ্গে আমি কাজ করবার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে, লালনগীতির এই বিশিষ্ট সাধক এখন আর বেঁচে নেই । খোদা বক্স তাঁর গুরু শুকচাঁদ শাহের সঙ্গে বিশ বছর কাটিয়েছেন । এই শুকচাঁদ শাহের গুরু ছিলেন বৃহত্তর যশোহর জেলার হরিরায়ঘাটের অন্য এক খোদা বক্স শাহ । এই খোদা বক্স শাহের গুরু ছিলেন মনিরুদ্দিন শাহ। মনিরুদ্দিন শাহ ছিলেন লালনের নিজের হাতে দীক্ষিত শিষ্য। খোদা বক্সের হিসেব অনুযায়ী তিনি লালনের পাঁচ শো গান (*২*) জানতেন এবং তার স্মৃতিভাণ্ডারে ৭৬ জন লোককবির ১৭০০ গান ছিল। (*৩*)
খোদা বক্স গানের প্রকাশিত পাঠ এবং তাঁর গুরুর কাছে শেখা পাঠের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। গানের পাঠের এই পার্থক্য, অর্থের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে । বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খোদা বক্সের পাঠ রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত খাতার পাঠের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে গানগুলো সঠিকভাবে চালু রয়েছে। বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত খাতায় যে সব গান নেই সে সব গানের পাঠ অন্তত আর একজন ফকিরের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করার চেষ্টা করেছি। এই ব্যাপারে বর্তমানে যশোহরনিবাসী প্রবীণ ফকির আব্দুল করিম শাহের সাহায্য পেয়েছি। খোদা বক্সের গাওয়া গানের পাঠ বিবেচনা করার সময় আমি এমন পদ্ধতি অনুসরণ করেছি, যাতে পাঠ সমালোচনার ভাষায় lectio difficilior উপেক্ষা করা না হয়(*৪*)। উপরন্তু খোদা বক্সের পাঠ গ্রহণের পূর্বে দেখতে হয়েছে তা বাউল ধর্ম এবং দর্শনের নিরিখে যুক্তিযুক্ত কিনা ।
লালনের গানের প্রকাশিত পাঠের সঙ্গে খোদা বক্সের মৌখিক পাঠ তুলনা করে দুটি উদাহরণ পেশ করছি। ‘কুলের বৌ হয়ে আর কত দিন থাকবি ঘরে’ এই মুখসহ লালনের গানের একটি পঙ্ক্তি ‘লালন গীতিকা’য় (মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র ১৯৫৮, ১৫ নং গান) এইভাবে দেওয়া আছে : দিস নে আর “আড়াই কড়ি”। এই গানের প্রসঙ্গে আমি ‘আড়াই কড়ি’র তাৎপর্য বুঝতে পারিনি। লালনের গানের বিভিন্ন সংকলন দেখে আমার সংশয় শুধু বাড়ে। (এই গানটি রবীন্দ্রনাথের পূর্বকথিত গানের খাতায় নেই ।)
‘আড়াই কড়ি’র বদলে ‘লালন শাহ ও লালন গীতিকা’য় (মুহম্মদ আবূ তালিব ১৩৭৫: দ্বিতীয় খণ্ড, ২৫৫ নং গান) ‘আচার কড়ি’ দেওয়া আছে। শাব্দিক অর্থ উদ্ধার করা গেলেও তাত্ত্বিক অর্থ আবিষ্কার করা যায় না। কি আচার অনুষ্ঠানের কথা এখানে বলা হচ্ছে তা স্পষ্ট নয় । ‘ভাবসঙ্গীত-এর (খোন্দকার রফিউদ্দিন ১৩৭৪, ২০৪ নং গান) পাঠে আছে, ‘আটির কড়ি’ ।
এই পাঠটি প্রসঙ্গের সঙ্গে সম্পর্কহীন বলে মনে হয় (*৫*) । খোদা বকসের পাঠ অনুযায়ী ‘কড়ি’র আগের শব্দটি ‘আঁচির’ হওয়া উচিত । এই পাঠ আমি প্রথম খোন্দকার রিয়াজুল হকের কাছে শুনেছি । উনি এই গানটির পাঠ খোদা বকসের কাছে পেয়েছেন এবং আমি পরে এই ব্যাপারে খোদা বক্সের অনুমোদন পেয়েছি। ‘আঁচি’ মানে ‘জননাশৌচ’(জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস : ১৩৪ প্রথম ভাগ) এবং ‘আচির কড়ি’ মানে যে টাকা দাইকে দেওয়া হয়। এই পাঠ বাউল ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থবহন করে। বাউলরা তাঁদের যৌনসাধনায় বীর্য ধারণ করার পদ্ধতি অনুসরণ করে। যাঁরা এই সাধনায় সফল হন তাঁদের সন্তানসন্ততি হয় না। তাই দাইয়ের টাকা আর দিতে হয় না। সম্পূর্ণ গানটির অর্থ বিচারে ‘আঁচি’ শব্দটি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ :
কুলের বৌ হয়ে মন আর কতদিন থাকবি ঘরে।
ঘোমটা খুলে চলে না রে যাই সাধ-বাজারে।
কুলের ভয়ে কাজ হারাবি, কুল কিনিবি সঙ্গে করে।
পস্তাবি শ্মাশানে যেদিন ফেলবে তোরে ।
দিস নে আর আঁচির কড়ি নাড়ার নাড়ী হও যেই রে।
ও তুই থাকবি ভালো সর্বকালো যাবে দূরে
কুলমান সব যে জন বাড়ায়, গুরু সদয় হয় না তারে।
লালন বেড়ায় পাতরার বেড়ায় কুল তাকে রে ॥ (*৬*)
‘আঁচির কড়ি’ পাঠটিকেই আমি সর্বাপেক্ষা যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করি ।
‘আদি মক্কা এই মানবদেহে’ এই মুখসহ লালনের গানের ভণিতা নিয়েই আমার দ্বিতীয় উদাহরণ। আমি লালনের যেসব গানের সংকলন নিরীক্ষা এবং পর্যালোচনা করেছি সেগুলিতে এই গানটির বেশির ভাগের ভণিতাপাঠ প্রায় একই। (রবীন্দ্রনাথের সংগৃহীত খাতায় আলোচ্য গানটি নেই ।) এই গানটির পাঠ যে বিকৃত হয়েছে সে সম্পর্কে বিখ্যাত বাউল-বিশেষজ্ঞ উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যও সন্দেহ করেননি। কিন্তু মৌখিক পাঠটি বাউল ধর্ম ও দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে সবচেয়ে অর্থপূর্ণ এবং লালনের অন্যান্য গানের সমর্থনপুষ্ট। গবেষকদের প্রকাশিত পাঠের বদলে মৌখিক পাঠটি প্রতিস্থাপিত করলে গানের মানে বদল হয়ে আসল অর্থ পাওয়া যায়। উক্ত সংকলনে (মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র ১৯৫৮ : ২৯৫ নং গান মুহম্মদ আবৃতালিব ১৩৭৫ : দ্বিতীয় খণ্ড, ১৬১ নং গান, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ১৩৭৮ : ৪৩ নং গান) আলোচ্য গানের ভণিতা মোটামুটি এইভাবে দেওয়া আছে :
ফকির লালন বলে সে যে গুপ্ত মক্কা
আদি ইমাম সেই মিঞে। (*৭*)
শ্রীযুক্ত ভট্টাচার্যের (১৩৭৮ : ৩২৫) মতে ‘মিঞে’ হচ্ছে ‘খোদা’র একটি প্রতিশব্দ। আবার ব্রাদার জেমস্ সম্ভবত ‘মিঞে’ শব্দকে ‘সাই’এর প্রতিশব্দ হিসেবে বিবেচনা করে তাঁর লালনের গানের অনুবাদ ‘Songs of Lalon’ (১৯৮৭ : ৭৮-৭৯) গ্রন্থে ‘মিঞে’ ‘Lord’ হিসেবে অনুবাদ করেছেন । কিন্তু ‘মিঞে’ অর্থাৎ ‘মিঞে’ (‘মিয়া’) শব্দটি বাংলায় মুসলমানদের একটি সম্মানসূচক শব্দ । যদিও প্রাচীন ইংরেজি ভাষা অনুসারে ‘মিঞে’ শব্দটি বড় জোর ‘Lord’ বলে অনুবাদ করা যেতে পারে তবুও এই শব্দটি বিশেষ কোনো বাংলা শব্দের সঙ্গে যুক্ত না হলে (যেমন ‘আল্লাহ মিয়া’) ‘God’-এর অর্থে ব্যবহার মোটে সমীচীন নয় ।
বাংলাদেশের প্রখ্যাত বাউল গায়ক মরহুম খোদা বক্সের পাঠ অনুযায়ী আলোচ্য গানে ব্যবহৃত ‘মিঞে’ শব্দটি আসলে ‘মেয়ে’। ‘মেয়ে’ কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষায় ‘মিইয়্যে’ এমন কি ‘মিয়া’ হিসেবে উচ্চারিত হয়। ‘মিঞে’ (সম্মানসূচক উপাধি) এবং ‘মিইয়্যে’র (অর্থাৎ ‘মেয়ে’র) মধ্যে ধ্বনিগত সাদৃশ্য থাকায় অনেকে ‘মিইয়্যে’ কথাটিকে ‘মিঞে’ হিসেবে মনে করছেন। ফলে শুদ্ধ ভাষায় গানটির ভণিতা হবে :
ফকির লালন বলে সে যে গুপ্ত মক্কা
আদি ইমাম সেই মেয়ে ৷
বাউলগায়ক আবদুল করিম শাহের কণ্ঠে উক্ত পাঠের অবিকল একই শব্দ উচ্চারিত হয়েছে।
কৌতূলবশত কুষ্টিয়ায় লালন ফকিরের আখড়া ছেঁউড়িয়ায় বেশ কিছু ফকিরকে এই ভণিতার পাঠের প্রকৃত শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি। ওঁরা সবাই এই ব্যাপারে একমত । গানটির কলি হচ্ছে, ‘আদি ইমাম সেই মেয়ে’ । প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে চাই যে দুটি সংকলনে, যথাক্রমে ‘ভাবসঙ্গীত’ (খোন্দকার রফি উদ্দীন ১৩৭৪: ১৫, ৪০ নং গান এবং ‘বাউল কবি লালন শাহ (আনোয়ারুল করীম ১৩৭৩ : ৩১৬, ১৯২ নং গান) পরিষ্কারভাবে ‘মেয়ে’ শব্দটি রয়েছে— ‘মিঞে’ নয় ।
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, লালন দর্শনে আশ্চর্যজনকভাবে আদি ইমামকে একজন শ্রদ্ধাস্পদ মহিলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অন্য সবার কাছে ‘আদি ইমাম’ মহিলা, এই বিষয়টি বিসদৃশ বিবেচিত হলেও বাউল সম্প্রদায়ের কাছে এ হলো ‘শক্তি’র প্রতি তাঁদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধার প্রকাশ। এই ‘শক্তি’ই হচ্ছে পরম করুণাময় আল্লাহর কুদরতের বহিঃপ্রকাশ। অথচ আরবী ভাষায় ‘ইমাম’ শব্দের অর্থ ধর্মীয় নেতা এবং সেই নেতা পুরুষগোত্রীয় ।
মুসলমান বাউলদের মধ্যে এই মর্মে বিশ্বাস রয়েছে যে, ‘আদি শক্তি’ হচ্ছে হজরত আলীর সহধর্মিনী বিবি ফাতেমা। এ জন্যই লালন ফকির তাঁর গানে (“ভজ রে জেনে শুনে’) বলেছেন : “নিলে ফাতেমার স্মরণ ফতে হয় করণ”। অর্থাৎ নিবিষ্টচিত্তে বিবি ফাতেমাকে স্মরণ করলে সাধন-সিদ্ধি হবেই। কেবলমাত্র ‘শক্তি’র মাধ্যমেই পরম করুণাময় সাই-এর দরবারে হাজির হওয়া সম্ভব (*৮*)।
এই পরিস্থিতিতে এই কথা স্পষ্টভাবে বলা যায় যে, প্রামাণ্য সংকলনের অভাবে অনুবাদের সময় অন্তত কয়েকটি লিখিত বা মুদ্রিত পাঠ ছাড়া কমপক্ষে একটি মৌখিক পাঠেরও তুলনা আবশ্যক। তা হলে সে ক্ষেত্রে অনুবাদ হবে বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য।
৩. গানের অর্থ বিশ্লেষণ
অনুবাদের কাজে হাত দেওয়ার আগে আমার সর্বশেষ ধাপ ছিল লালনের আক্ষরিক এবং সাংকেতিক অর্থ খুঁজে বের করা। লালনের গানগুলো দুর্বোধ্য পারিভাষিক এবং সাংকেতিক শব্দ ছাড়াও হেঁয়ালি তার দ্ব্যর্থবোধক শব্দে পরিপূর্ণ। এই জন্যেই লালন- সঙ্গীতের অর্থ একেক গায়কের কাছে একেক ধরনের হতে পারে; এমনকি কোনো কোনো গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে গায়করা হতবুদ্ধি পর্যন্ত হয়ে যান । সাধারণত বাউলরা গানের অর্থের বিস্তারিত বিশ্লেষণ না জেনেই গান শিখতে শুরু করেন। অবশ্য দুর্বোধ্য গানের ক্ষেত্রে সময় সময় বাউলরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে থাকেন। কিন্তু অধিকাংশ সময়ে এঁরা নিজেরাই গানের ভাবার্থ বের করার কাজ সমাধা করেন। তাই গানের অর্থ বিশ্লেষণেও একজন ফকিরের ব্যাখ্যা গ্রহণের পূর্বে দেখতে হয়েছে যে, লালন এবং অন্যান্য কবিরা তাঁদের গানে যা ব্যক্ত করেছেন এবং বাউলদের তত্ত্ব ও সাধনা সম্পর্কে আমার যেটুকু জ্ঞান-অর্জন হয়েছে তার সঙ্গে সেই ব্যাখ্যাটি সংগতিপূর্ণ কিনা । বাউলগানে প্রতীকী ভাবধারার ব্যবহার, যৌনসাধনার পরোক্ষ উল্লেখ এবং মুসলিম বাউল মতবাদ সম্পর্কে ধারণার ক্ষেত্রে আমি খোদা বকস এবং করিম শাহের সঙ্গে আলাপ আলোচনায় বিশেষ উপকৃত হয়েছি। এই ধরনের আলোচনার মাধ্যমে আমি নানা পারিভাষিক শব্দ, কুষ্টিয়ার আঞ্চলিক ভাষার বেশ কিছু দুর্বোধ্য শব্দ এবং অপ্রচলিত বাগধারাগত প্রকাশভঙ্গি সম্পর্কে অবহিত হয়েছি। এ ছাড়াও খোদা বক্স কিছু শ্লেষাত্মক শব্দের বিশ্লেষণ করে আমাকে এ বিষয়ে সহজভাবে বুঝিয়ে দিয়েছেন। তা না হলে আমার পক্ষে এ সব অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হতো না ।
লালনের গানের গূঢ় অর্থ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে আমি বেশ কিছু অদ্ভুত ধরনের পক্তি প্রয়োগ দেখে বিমূঢ় হয়ে পড়তাম এবং নিজের অনুবাদ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারতাম না; এমনকি কোনও কোনও জায়গায় আমার অনুবাদে ভুল হতো। এই ধরনের অর্জিত জ্ঞান আমার অনুবাদকর্মে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে, যার ফলে মূল গানের গূঢ় বক্তব্য এবং অর্থ সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পেরেছি ।
বাউলগানের অন্তর্নিহিত অর্থ সম্পর্কে আমার ধারণার ফলে আমি অনুবাদের সময় এমন কোনও অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার করিনি যে সব শব্দ মূল গানের অন্তর্ভুক্ত নয়। উপরন্তু আমি মূল গানের দুর্বোধ্য বিষয়গুলি পাদটীকায় ব্যাখ্যা করেছি । উদাহরণ স্বরূপ আমি এখানে ‘আগে জানো না মনুরায়— লালনের এই গানটির ধূয়ার অনুবাদের উল্লেখ করতে চাই:
Didn’t you know before
Oh king of my mind?
If you lose the game.
You’ll die of shame,
What’s the use of crying
When its over. (*৯*)
এই অনুবাদ মূলের কাছাকাছি বলে আমার মনে হয়। আমি ঐ অংশের ‘বাজি’ শব্দটির অর্থ করেছি ‘খেলা’ ইংরেজীতে ‘game’, কিন্তু খোদা বক্সের কাছ থেকে আমি এর আরো গূঢ় অর্থ পেয়েছি। তাঁর মতে ‘বাজি’ শব্দটি কবির কৌশলময় ব্যবহারে আরো অর্থপূর্ণ; ‘বাজি’ হচ্ছে ‘বীজ’ অর্থাৎ ‘বীর্য’-র একটি চাতুর্যপূর্ণ সাংকেতিক শব্দ। এই কথাটা একবার বুঝতে পারলে কিভাবে খেলা করতে হয়, গানে তার বর্ণনা রূপকার্থে উপস্থাপিত হয় । এই রূপকই হচ্ছে বীর্যধারণের গুরুত্বের বহিঃপ্রকাশ ।
প্রসঙ্গত বলতে হচ্ছে যে, লালন ফকির যে গূঢ় অর্থে ‘বাজি’ অর্থাৎ,‘game’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, আমি ইংরেজিতে ঠিক সেই রকম অর্থময় কোনও প্রতিশব্দ খুঁজে পাইনি । আলোচ্য গানটিতে যেভাবে ‘বাজি’ শব্দের সঙ্গে ‘বীজ’ এর উচ্চারণগত এবং ধ্বনিগত সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়, সেভাবে ইংরেজী শব্দ ‘game’, আর ‘Semen’-এর একটি প্রতিশব্দের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে পারি নি। যদিও আমি কবির শব্দকৌতুক বজায় রাখতে পারি নি, তবু তাঁর খেলার ঢংটিকে স্পর্শ করতে চেষ্টা করেছি। এখানে রূপকের গূঢ় অর্থ সম্পর্কে আমি যেটুকু জ্ঞানলাভ করেছি তা অনুবাদের মূল সুরটিরই উপর প্রভাব বিস্তার করেছে, শব্দ বাছাই-এর উপর নয় ।
গানটির শেষ স্তবকের আক্ষরিক অনুবাদ অনেকটা এ রকম হবে মনে হয়:
A Person who obstructs the oozing and plays…
does anyone have the ability to attack his body’?
কিন্তু আমি পঙ্ক্তিটির অনুবাদ এভাবে করেছি:
Can anyane attack a fellow
Who plugs up the leak and plays?
চোয়ানি oozing মানে বীর্যপাতপূর্ব-ক্ষরণ। চোয়ানি বেরুলে বীর্যপতনের ভয় থাকে। এই গানটির ধর্মীয় আচারের তাৎপর্য সম্পর্কে খোদা বক্স আমাকে বিশ্লেষণ করে না বোঝানো পর্যন্ত, আমি এই শব্দ নিয়ে হতবুদ্ধি ছিলাম; আলোচ্য প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আমার কাছে অর্থহীন মনে হচ্ছিল । যখন এই গানের গূঢ় অর্থ বুঝতে পারলাম, তখন আমি প্রাণবন্ত ও মূলানুগ অনুবাদে সক্ষম হলাম । আমি যদি এই সব গানের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ধরতে না পারতাম তা হলে আমার এই অনুবাদ অসংলগ্ন এবং যান্ত্রিক হয়ে পড়তো ।
একটি রচনা ভাষান্তর করতে গেলে প্রত্যেক অনুবাদককে একই সমস্যা পূরণ করতে হয়— এই হচ্ছে মূলের ভাষা এবং অনুবাদের ভাষার মধ্যে অন্তর্নিহিত পার্থক্য কিন্তু বাউলের মত একটি গূঢ় গুহ্য লোক-সম্প্রদায়ের সাধনসঙ্গীত অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদককে কয়েকটি অতিরিক্ত সমস্যার সমাধান সূত্র আবিষ্কার করতে হয় । না হলে অনুবাদ অনেক সময় অর্থহীন কিংবা ভ্রমাত্মক হয়ে পড়ে। আলোচ্য প্রবন্ধে লালন ফকিরের গানের প্রামাণিকতা নির্ধারণ, সঠিক পাঠ নির্ণয় এবং অর্থবিশ্লেষণের জটিলতা বর্ণনা করে তত্ত্বজ্ঞানী এবং সঙ্গীতজ্ঞানী লালনপন্থী ফকিরদের সঙ্গে গানের আলোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখানোর চেষ্টা করেছি। খোদা বক্স বিশ্বাস এবং আব্দুল করিম শাহের কাছে লালনগীতি সম্পর্কে যেটুকু জ্ঞান অর্জন করেছি তাই হলো আমার অনুবাদের প্রধান প্রেরণা ও অবলম্বন ।
তথ্য-নিৰ্দেশ:
- বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রসদন, পাণ্ডুলিপি নং ১৩৮ এ, I এবং II প্রথম ১২৬টি গান এবং দ্বিতীয় খাতায় ১৭২টি গান, অর্থাৎ সব মিলে ২৯৮টি গান। সনৎকুমার মিত্রের হিসেব অনুযায়ী (১৩৮৬ : ১০৮) একটি গান লিখে কেটে দেওয়া হয়েছে এবং ১২টি গান দুবার লেখা হয়েছে বলে মোট ২৮৫টি গান আছে।
- লুৎফর রহমান ১৩৯২ : ভূমিকা, ১
- ব্যক্তিগত যোগাযোগ
- lectio difficilior : জটিলতর পাঠ, অর্থাৎ প্রথম পাঠে অর্থোদ্ধার হয় না, কিন্তু সূক্ষ্ম বিচারে তার তাৎপর্য ধরা পড়ে ।
- ‘আটির কড়ি’ সম্পর্কে শ্যামলী চক্রবর্তী ও জয়ন্তকুমার চক্রবর্তীর ধারণা উল্লেখযোগ্য। সন্তান জন্মের অষ্ট দিনে ‘আটকৌড়ি’ কিংবা ‘আটীকেড়ে’ বলে হিন্দুদের একটি অনুষ্ঠান হয় । যশোহরে নবজাতকের মঙ্গলার্থে আটটি। ছোট ছেলেকে খই-বাতাসা এবং আটটি কড়ি দেওয়া হয়। (প্রদেশ অনুযায়ী এই অনুষ্ঠানের কিছু পার্থক্য আছে।) তাঁদের মতে ‘আটির কড়ি— এই মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের নির্দেশকও হতে পারে ।
- ‘লালন গীতিকা’তে (মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র ১৯৬৮ : ১৪ নং গান) এবং ‘লালন শাহ ও লালন গীতিকা’য় (মুহম্মদ আবূ তালিব ১৩৭৫ : দ্বিতীয় খণ্ড ২৫৫ গান) ফাতরার বদলে ‘কাতরে’ দেওয়া হয়। ‘ফাতরা’-র অর্থ : ‘সুকনো কলাপাতার বেড়া’। এই পাঠটি উক্ত দুটি সংকলনের পাঠটির চেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ আর বর্ণনামূলক এবং এটি খোদা বক্সের মৌখিক পাঠ। আমার মনে হয় পাণ্ডুলিপিতে ‘ক’ ও ‘ফ’-র সাদৃশ্যের জন্যে এ ভুল ঘটেছে।
- ‘লালন গীতিকা’তে (মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র ১৯৫৮ : ২৯৫ নং গান) ‘ফকির’-এর বদলে ‘সাঁই’ দেওয়া আছে এবং ‘লালন গীতিকা’তে (মুহম্মদ আবু তালিব ১৩৭৫ : দ্বিতীয় খণ্ড ১৬১ নং গান) ‘লালন’-এর আগে কোনও উপাধি নেই। কিন্তু পাঠের এই সামান্য পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ নয় । অর্থের উপর প্রভাব ফেলে না।
- লালন তাঁর গানটিতে ‘যে রূপে সাঁই আছে মানুষে’ শক্তি’-কে ‘লা মোকাম’-এর দ্বারী হিসেবে বর্ণনা করেন : ‘লালন বলে তার দ্বারের দ্বারী আদি মাতা সে’। এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে শিয়া (Twelver ShTT সম্প্রদায়ের ধর্ম বিশ্বাসে ‘ইমাম’-এর প্রায় একই রকম বর্ণনা পাই। “ইমাম’কে আল্লার কাছে প্রবেশপথ’ বলা হয় (Eliade ১৯৮৬ : ৭, imamate)
- আগে জানো না মনুরায়
বাজী হারিলে তখন
লজ্জায় মরণ
শেষে আর মিছে কান্দিলে কি হয় ।
- চোয়নি বান্দিয়ে খেলে যে জনা
কাহারো যে সাধ্য সে অঙ্গে দেয় হানা ৷
গ্রন্থপঞ্জী
বাংলা
আনোয়ারুল করীম
১৩৭৩ (১৯৬৬) ‘বাউল কবি লালন শাহ’ । দ্বি-সং কুষ্টিয়া : মিল্কী হাউস।
উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
১৩৭৮ (১৩৭১) ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ । দ্বি-সং কলিকাতা : ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানী।
এস. এম. লুৎফুর রহমান, সম্পাদক
১৩৯২ (১৯৮৫) ‘লালন-গীতি চয়ন’ । ঢাকা : ধারণী সাহিত্য সংঘ ।
খোন্দকার রফিউদ্দিন, সম্পাদক
১৩৭৪ (১৯৬৬) (১৯৫৫] ‘ভাব-সঙ্গীত’। দ্বি-সং কুষ্টিয়া : খোন্দকার রফিউদ্দিন।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস
১৩৪৪ (১৯৩৭) (১৩২৩ (১৯৭১)] ‘বাঙালা ভাষার অভিধান’। দ্বি-সং দু’খণ্ড। পুনর্মুদ্রণ ১৯৭৯। কলিকাতা : শিশু সাহিত্য সংসদ প্রাইভেট লি. ।
মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র, সম্পাদক
১৯৫৮ ‘লালন-গীতিকা’ । কলিকাতা : কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ।
মুহম্মদ আবূ তালিব, সম্পাদক
১৩৭৫ (১৯৬৮) ‘লালন শাহ ও লালন গীতিকা’। দু’খণ্ড, ঢাকা : বাংলা একাডেমী ।
সনৎকুমার মিত্র
১৩৮৬ ‘লালন ফকির : কবি ও কাব্য’ । কলিকাতা : সাহিত্য প্রকাশ।
ইংরেজী
Eliade, Mircea (ed.)
1986 The Encyelopedia of Religion, New York: Macmillan.
James, Brother
1987 Songs of Lalon, Dhaka, University Press Limited.
(ডক্টর ক্যারোল সলোমন (১৯৪৮খ্রিঃ–২০০৯খ্রিঃ) এর “লালন গীতির অনুবাদ – প্রসঙ্গ: একটি ভূমিকা” নিবন্ধটি আবুল আহসান চৌধুরী এর সংগ্রহ-গবেষণা-ভূমিকা- সম্পাদনায় “লালন সমগ্র” থেকে অবিকল অবিকৃতি রূপে উপস্থাপন করা হল পাঠকের নিমিত্তে)