রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের পাণ্ডুলিপিঃ আবুল আহসান চৌধুরী

বাঙালির লোকধর্ম হিসেবে বাউলের মত ও সাধনার ধারা যথেষ্ট প্রাচীন হলেও গুরুবাদী সংগীতাশ্রয়ী এই মরমি সম্প্রদায়ের সাধকদের রচিত আদি গানের সন্ধান পাওয়া যায় না। যদিও মরমি সাধনা ও সংগীতের অনুরাগী ক্ষিতিমোহন সেন কিছু প্রাচীন বাউলগান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মুগ্ধতা সত্ত্বেও সেইসব গানের অকৃত্রিমতা ও পদকর্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয়ের অবকাশ আছে। সে-ক্ষেত্রে লালনকেই বাউলগানের প্রথম ও শ্রেষ্ঠ পদকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। পাশাপাশি বলতে হয় লালন ছিলেন বাউলসাধনার প্রাজ্ঞ ভাষ্যকারও।

২.

লালন শতবর্ষেরও বেশি আয়ু পেয়েছিলেন। যদি ধরে নেওয়া যায়, তিনি চল্লিশ বছর বয়সেও বাউলমতে দীক্ষাগ্রহণ করেন, তাহলেও দীর্ঘজীবী লালন কমপক্ষে পৌনে এক শতক কাল গান বেঁধেছিলেন। লালন ‘ভাবের আবেশে’ গান রচনা করতেন। সেইসব সৃষ্টিশীল মুহূর্তে আবেগ-স্পন্দিত লালন ‘ওরে আমার পুনা মাছের ঝাঁক এসেছে’ (বসন্তকুমার পাল : মহাত্মা লালন ফকির। শান্তিপুর-নদীয়া, ১৩৬২; পৃ. ২৬) বলে গানের বাসরে শিষ্যদের আহ্বান জানাতেন। জানা যায় : ‘ইহাতে আর সময় অসময় ছিল না। সর্বদাই এই “পুনা মাছের ঝাঁক” আসিত। এই যে সাধনার অনুষঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রচিত গান—তার সংখ্যা কত হবে তা নির্ণয় করা কঠিন। ‘হিতকরী’ পত্রিকায় সংখ্যার ধারণা না দিয়ে বলা হয়, ‘লালন ফকিরের অসংখ্য গান সর্ব্বত্রে সর্বদাই গীত হইয়া থাকে (হিতকরী (পাক্ষিক, কুষ্টিয়া): ১ ভাগ ১৩ সংখ্যা, ১৫ কার্তিক ১২৯৭; পৃ. ১০২)। প্রবাসীর ১৩২২-এর ভাদ্র সংখ্যায় ‘হারামণি’ বিভাগে করুণাময় গোস্বামী সংগৃহীত লালনের গানের শেষে নিতান্তই অনুমানের উপর নির্ভর করে উল্লেখ করা হয়, লালনের বোধহয় সহস্র গান আছে’। মতিলাল দাশ বলেছেন : ‘লালনের প্রায় ছয়শত গান সংগ্রহ করিতে পারিয়াছি—আরও পাওয়া যায় কিনা, চেষ্টা করিতেছি’(আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিতঃ লালন স্মারকগ্রন্থ। ঢাকা, চৈত্র ১৩৮০, পৃ. ৪৪)। কিন্তু তিনি ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে সংগৃহীত লালনের যে গানগুলো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশের জন্য দেন, তার সংখ্যা ৩৭১(মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র সম্পাদিতঃ লালন-গীতিকা। কলকাতা, ১৯৫৮; পৃ. ভূমিকা-সাত)। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের সংগৃহীত লালনগীতির সংখ্যাও বোধহয় ছয়শোর ঘর পেরিয়ে যাবে না। বর্তমান সম্পাদক সংকলিত লালনসমগ্র বইয়ে লালনের গানের খাতা, হারামণি ও অন্যান্য সূত্র থেকে মোটের ওপর লালনের ৬৪২টি প্রামাণ্য পদ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।(আবুল আহসান চৌধুরী সংকলিত- সম্পাদিত: লালনসমগ্র। ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৮)। উক্ত সম্পাদক-সংগৃহীত একটি পুরোনো সূচিপত্রে লালনের ৫৩০টি গানের মুখ পাওয়া যায়, অবশ্য কয়েকটি ক্রমিককে কোন গানের উল্লেখ নেই। অন্নদাশঙ্কর রায় ধারণা করেছেন :

তাঁর [লালন] গান রচনা প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলেছিল। একশো বছরে অন্তত দশ হাজার গান রচিত হয়েছিল। সেসব গান কেউ লিখে রাখে নি, তাঁর জীবিতকালে ছাপাও হয়নি (অন্নদাশঙ্কর রায়। লালন ও তাঁর গান। কলকাতা, বুদ্ধপূর্ণিমা ১৩৮৫, পৃ. ১৫)।

অন্নদাশঙ্কর-কথিত লালনের গানের সংখ্যা অতিরঞ্জিত বলেই মনে হয়। কেননা দীর্ঘজীবন-লাভের সঙ্গে সৃষ্টিশীলতার সঙ্গতি কী সবসময়ই রক্ষিত হয়? বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সৃজনক্ষমতাও প্রাকৃতিক নিয়মেই কমে আসে। আর বাউলগানের বিষয়-পরিধি অত্যন্ত সীমিত, প্রসঙ্গের বৈচিত্র্য না থাকলে কল্পনা বা শৈল্পিক উদ্ভাবনী শক্তি জাগে না—সে-ক্ষেত্রে শুধুই পুনরাবৃত্তি এবং একই বিষয়ের আবর্তন চলতে থাকে। লালনের ‘গান কেউ লিখে রাখে নি, তাঁর জীবিতকালে ছাপাও হয় নি’—এ-তথ্যও সঠিক নয়।

লালন মুখে মুখে গান রচনা করতেন, কিন্তু সেইসব গান নিরক্ষর লালনের পক্ষে লিখে রাখা সম্ভব ছিল না, সেই কাজটি করতেন তাঁর শিষ্যরা—বিশেষ করে মনিরুদ্দীন শাহ ও মানিক শাহ (মানিক পণ্ডিত নামে পরিচিত)। মূল খাতা থেকে নকল করে নতুন খাতাও তৈরি হতে সাধকশিল্পীদের প্রয়োজনে। মনিরুদ্দীনের হাতের লেখার খাতাই এ-পর্যন্ত পাওয়া গেছে—মানিক পণ্ডিত লিপিকর হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকলেও সেইসব খাতার হদিস মেলে নি। মনিরুদ্দীন-লিপিকৃত একাধিক খাতার সন্ধান মিলেছে। বর্তমান সম্পাদক ও আরো কারো কারো সংগ্রহে এই ধরনের খাতা আছে। রবীন্দ্রনাথও এইরকম দুটি খাতা সংগ্রহ করেন লালনের ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে।

৩.

লালনের গান সংগ্রহ ও প্রকাশের ইতিহাস যথেষ্ট প্রাচীন। লালনচর্চা শুরু হয়েছিল বেশ আগেই। এ-যাবৎ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কাঙাল হরিনাথের রচনাতেই প্রথম লালন সাঁইয়ের উল্লেখ মেলে(গ্রামবার্তা প্রকাশিকা (সাপ্তাহিক, কুমারখালী): ভাদ্র ১ম সপ্তাহ ১২৭৯, পৃ. ১৫)। এমন কী লালনের গানও প্রথম প্রকাশিত হয় হরিনাথের সৌজন্যেই, ‘কে বোঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা, তাঁর ব্রহ্মাণ্ডবেদ (১ম ভাগ ১ম সংখ্যা, ১২২৯; পৃ. ২৫১) গ্রন্থে। লালনের মৃত্যুর (১ কার্তিক ১২৯৭ / ১৭ অক্টোবর ১৮৯০) পরপরই মীর মশাররফ হোসেন পরিচালিত পাক্ষিক হিতকরী পত্রিকায় (১৫ কার্তিক ১২৯৭/৩১ অক্টোবর ১৮৯০) ‘মহাত্মা লালন ফকীর’ নামে যে নিবন্ধ (অস্বাক্ষরিত হলেও যুক্তিসিদ্ধ ধারণা অনুসারে রাইচরণ দাস লিখিত) প্রকাশ পায় তাতে লালনের ‘সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে’ গানটি উদ্ধৃত হয়। নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়-সংকলিত ভারতীয় সঙ্গীত মুক্তাবলী (১ম খণ্ড, কলকাতা, ১৩৩০)-তে লালনের তিনটি গান স্থান পায়। লালনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর সরলা দেবী ভারতী পত্রিকায় ১৩০২ সালের ভাদ্র সংখ্যায় ‘লালন ফকির ও গগন’ নামে একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। এতে লালনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ এগারোটি গান প্রকাশিত হয়। উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতকোষ (১৩০৩)-এ লালনের ‘দেখ না মন ঝকমারি এ দুনিয়াদারি’ গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ১৩০৫-এ বীণা-বাদিনী পত্রিকায় (৭ সংখ্যা ২ ভাগ / ৮ সংখ্যা ২ ভাগ) ইন্দিরা দেবী-কৃত লালনের দুটি গানের (‘ক্ষম অপরাধ ওহে দীননাথ’ ও ‘কথা কয় কাছে দেয় না’) স্বরলিপি প্রকাশিত হয়। সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় (২ সংখ্যা, ১৩১১) মোক্ষদাচরণ ভট্টাচার্য তাঁর ‘নিরক্ষর কবি ও গ্রাম্য কবিতা’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রবন্ধের এক পর্যায়ে লালনের পরিচয় দিতে গিয়ে তাঁর দুটি গান উদ্ধৃত করেন (‘আমি একদিনও দেখিলাম তারে’ ও ‘আমার এই ঘরখানায় কে বিরাজ করে)। দুর্গাদাস লাহিড়ীর বাঙ্গালীর গান (১৩১২), কুমুদনাথ মল্লিকের ‘নদীয়া কাহিনী’ (১৩১৭ ও অনাথকৃষ্ণ দেবের ‘বঙ্গের কবিতা’(১৩১৮) গ্রন্থেও লালনের গান সংকলিত হয়। সুবোধচন্দ্র মজুমদার ‘গ্রামসাহিত্য’ নামে নবপর্যায়ের বঙ্গদর্শন পত্রিকায় (বৈশাখ ১৩১৬) লালন সম্পর্কে যে প্রবন্ধ প্রকাশ করেন তাতে লালনের সাতটি গান জুড়ে দেন।(সৈয়দ মনসুর আহমদ নানা সূত্র থেকে তথ্য আহরণ করে পরিবেশন করেছেন তাঁর যুক্তবঙ্গে লালনচর্চার ক্রমবিকাশ (ঢাকা, মাঘ ১৪১৩) গ্রন্থে)।

(ঢাকা, মাঘ ১৪১৩) গ্রন্থে) কাঙাল-শিষ্য জলধর সেন তাঁর কাঙাল হরিনাথ (১ম খণ্ড, ১৩২০) গ্রন্থে লালন সম্পর্কে চুম্বক মন্তব্যসহ একটি গান প্রকাশ করেছেন। কাঙাল হরিনাথের জ্ঞাতি-ভ্রাতুষ্পুত্র ভোলানাথ মজুমদার যে লালনের জীবনী ও গান সংগ্রহ করেন সে সাক্ষ্য দিয়েছেন বাউলগবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তাঁর সূত্রে জানা যায় :

কুমারখালী-নিবাসী বৃদ্ধ ভোলানাথ মজুমদার মহাশয় ঐ অঞ্চলে সর্বপ্রথম লালনের গান সংগ্রহ করেন এবং লালনের সম্বন্ধে কয়েকটি প্রবন্ধও দু-একটি সভায় পাঠ করেন (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য: বাংলার বাউল ও বাউল গান। দ্বি-স: কলকাতা, নববর্ষ ১৩৭৮; পৃ. ৫৪১)।

প্রবাসী পত্রিকায় নানা সময়ে লালনের গান প্রকাশিত হয়েছে। বৈশাখ ১৩২২-এ এই পত্রিকায় ‘হারামণি’ নামে লোকগান প্রকাশের জন্য একটি বিভাগ প্রবর্তিত হয়। শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গানটি ‘মনের মানুষের সন্ধানে’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। ঐ সালেরই শ্রাবণ সংখ্যায় ‘হারামণি’ বিভাগে সতীশচন্দ্র দাসের সংগ্রহ থেকে ‘কথা কয় রে রে—দেখা দেয় না’ এবং ‘পাখী কখন যেন উড়ে যায়’—লালনের এই দুটি গান প্রথম প্রকাশ পায়। ভাদ্র সংখ্যায় প্রকাশিত হয় গগন হরকরার সূত্রে করুণাময় গোস্বামী-সংগৃহীত ‘খুলবে কেন সে ধন (ও তার) গায়ক বিনে’। রবীন্দ্রনাথের আগে লালনের গান সংগ্রহ ও প্রকাশের এই হলো সংক্ষিপ্ত খতিয়ান।

৪.

লালনের গান প্রকাশে অন্যদের তুলনায় রবীন্দ্রনাথের কিছু বিলম্ব হলেও লালনের প্রতি তাঁর প্রীতি ও মনোযোগ বেশ আগেই জেগেছিল। বাউলের গান ও দর্শন রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রাণিত ও প্রভাবিত করেছিল। অনেকটাই বাউলের ‘মনের মানুষে’র সাদৃশ্যে গড়ে উঠেছিল তাঁর ‘জীবনদেবতা’র তত্ত্ব। অবশেষে তিনি রূপান্তরিত হয়েছিলেন ‘রবীন্দ্রবাউলে’। তাঁর এই মানস-রূপান্তরের মূলে ছিলেন লালন— তাঁর গান আর দর্শনই রবীন্দ্রনাথকে মানবিক মরমি উপলব্ধিতে উত্তীর্ণ করেছিল।

যে মরমিসাধকের প্রভাব রবীন্দ্রমানসে গভীরভাবে মুদ্রিত হয়েছিল, তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ পরিচয় ও সাক্ষাৎ হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে দ্বিমত আছে। জলধর সেন, বসন্তকুমার পাল, অজিতকুমার স্মৃতিরত্ন, সাধক গোঁসাই গোপালের পুত্র রাসবিহারী জোয়ারদার, সুকুমার সেন, বিনয় ঘোষ এবং আরো কেউ কেউ রবীন্দ্র-লালন সাক্ষাতের পক্ষে মত দিয়েছেন নিছক অনুমান কিংবা জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে। অপরপক্ষে এই সাক্ষাৎ যে হয়নি তার পক্ষে যুক্তি দিয়ে সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন হিরণ্ময় বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্নদাশঙ্কর রায়, অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী—এঁরা। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন ও চিন্তাহরণ দেবও এই সাক্ষাৎকার সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

লালনের সঙ্গে এই মুখোমুখি আলাপ-পরিচয় হওয়া না-হওয়ার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজেও কিছু প্রহেলিকা রচনা করে গেছেন। তাঁর নিজেরই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য বিষয়টিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। যেমন, মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন-সংকলিত হারামণি’র (১ম খণ্ড: কলকাতা, ১৩৩৭) ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: “শিলাইদহে যখন ছিলাম, বাউলদলের সঙ্গে আমার সর্বদাই দেখা সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হতো।” লালন ফকির এই নির্বিশেষ ‘বাউলদলে’র অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোন ধারণা পাওয়া যায় না।

১৯২২ সালে শ্রীনিকেতন পল্লীসেবা বিভাগের গ্রামীণ উন্নয়নের কাজের ধারা নির্ধারণ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গক্রমে কালীমোহন ঘোষকে বলেছিলেন:

তুমি তো দেখেছো শিলাইদহতে লালন শাহ ফকিরের শিষ্যগণের সহিত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার কিরূপ আলাপ জমত। তারা গরীব। পোষাক-পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝবার জো নাই তারা কত মহৎ। কিন্তু কত গভীর বিষয় কত সহজভাবে তারা বলতে পারত (শান্তিদেব ঘোষ: রবীন্দ্রসঙ্গীত বিচিত্রা। কলকাতা, জুলাই ১৯৭২, পৃ. ১১৬)।

এই উক্তি থেকে ধারণা জন্মায় যে, রবীন্দ্রনাথ লালন নন, তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। লালনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় থাকলে এ-ক্ষেত্রে তাঁর উল্লেখই প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্ববহ হতো। আর আলাপ-পরিচয় থাকলে তা গোপনের কোন কারণ আছে বলেও মনে হয় না— অস্বীকার করারও নেই কোন যুক্তি।

আবার অপরপক্ষে নীচে বর্ণিত তথ্য থেকে মনে হতে পারে উভয়ের আলাপ-পরিচয় ছিল। বসন্তকুমার পাল লালনজীবনী রচনায় রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতা প্রার্থনা করে তাঁকে পত্র লেখেন। কবির পক্ষ থেকে সেই চিঠির জবাব দেন তাঁর একান্ত সচিব সুধীরচন্দ্র কর। ২০ জুলাই ১৯৩৯ তারিখে শান্তিনিকেতন থেকে লিখিত পত্রে বসন্তকুমারকে জানানো হয়:

কবি আপনার চিঠি পেয়ে সুখী হয়েছেন। আপনাকে এই মহৎ কাজে সাহায্য করতে পারলে তিনি আরো সুখী হতেন সন্দেহ নাই। ফকির সাহেবকে তিনি জানতেন বটে কিন্তু সে তো বহুদিন আগে; বুঝতেই পারেন এখন সে সব সুদূর স্মৃতির বিষয় তাঁর মনে তেমন উজ্জ্বল নয় (আবুল আহসান চৌধুরী: লালন সাঁইয়ের সন্ধানে। ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৭; পৃ. ৭৩)।

‘ফকির সাহেবকে [লালন] তিনি [রবীন্দ্রনাথ] জানতেন’— এই উক্তিটি অবশ্য উভয়ের আলাপ-পরিচয়ের ধারণাকে সমর্থন করে।

রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্বভার নিয়ে শিলাইদহে আসেন ১৮৯০ সালের উপান্তে, ততদিনে লালনের মৃত্যু (১৭ অক্টোবর ১৮৯০) হয়েছে। তাই এইসময়ে দেখা হওয়া সম্ভব নয়। তবে জমিদারির দায়িত্ব গ্রহণের আগে ছেলেবেলা থেকেই বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ অনেকবারই শিলাইদহে এসেছেন। সেই সময়ে লালন ফকিরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হওয়া অসম্ভব ছিল না। কিন্তু এ বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্তে আসার পক্ষে সুস্পষ্ট তথ্যপ্রমাণের একান্তই অভাব। তবে এ-কথা স্বীকার করতেই হয়, লালনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ হোক আর নাই হোক, লালনের গান যে রবীন্দ্রমানসে দূরপ্রসারী প্রভাব ও প্রেরণা সঞ্চারিত করেছিল, সে বিষয়ে দ্বিমত বা বিতর্কের কোন অবকাশ নেই।

৫.

বাউলের গানের সুর ও বাণী, তত্ত্ব ও শিল্প রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। এইসব গান তাঁর চিত্ত ও শিল্পলোক—উভয় ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলেছে। বলেছেন তিনি ।

….বাউল পদাবলীর প্রতি আমার অনুরাগ আমি অনেক লেখায় প্রকাশ করেছি। … আমার অনেক গানেই আমি বাউলের সুর গ্রহণ করেছি। এবং অ‍নেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে বাউলসুরের মিল ঘটেছে। এর থেকে বোঝা যাবে, বাউলের সুর ও বাণী কোন এক সময়ে আমার মনের মধ্যে সহজ হয়ে মিশে গেছে (মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন হারামণি, ১ম খণ্ড। কলকাতা, বৈশাখ ১৩৩৭ । পৃ. (আশীৰ্ব্বাদ)।

অন্যত্র তিনি উল্লেখ করেছেন: ‘আমার অনেক গান বাউলের ছাঁচের, কিন্তু জাল করতে চেষ্টাও করি নি, সেগুলো স্পষ্টত রবীন্দ্রবাউলের রচনা (নন্দগোপাল সেনগুপ্তঃ কাছের মানুষ রবীন্দ্রনাথ। কলকাতা, ওরিয়েন্ট সংঘ ১৯৫৮ : পৃ. ১০০)। বাউলভাবনার সপক্ষে তাঁর এই মানস-রূপান্তরে লালনের প্রভাব গভীর ও প্রত্যক্ষ।

লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ রবীন্দ্রনাথের ভাবজগতের পরিচালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে । এই গানটি তাঁর জীবনচেতনার প্রেরণা হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সুকুমার সেন যথার্থই মন্তব্য করেছেন : ‘বাউলগানের এই … পদটি কবিচিত্তে দীক্ষাবীজ বপন করিয়াছিল (সুকুমার সেন : বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস, ৩য় খণ্ড। তৃ-স: কলকাতা পৃ. ৪৮৮)। এ-বিষয়ে শশিভূষণ দাশগুপ্ত বলেছেন : ‘… লালন ফকিরের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ এই জিজ্ঞাসার সহিত রবীন্দ্রনাথের জীবন-জিজ্ঞাসার গভীর মিল ছিল… (মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র সম্পাদিত: লালন-গীতিকা পূর্বোক্ত, পৃ. ভূমিকা-চার)। লালনের প্রতি তাঁর অনুরাগ ও মনোযোগ যে কত গভীর ছিল, তাঁর পাঠ্যতালিকায় লালন যে কতখানি গুরুত্ব অর্জন করেছিলেন সে সম্পর্কে জানা যায় : “বেদ-উপনিষদ’ থেকে ‘বাইবেল’ ও লালন শাহের জীবনী সর্বদা তাঁর টেবিলে থাকত(সৈয়দ আকরম হোসেন: রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস : চেতনালোক ও শিল্পরূপ)।

বাউলতত্ত্ব ও দর্শন, যা লালনে এসে সংহত ও একটি পূর্ণরূপ লাভ করে, রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। বাউলগান, বিশেষ করে লালনের গান রবীন্দ্রমানসে যেমন তাঁর সংগীতেও তেমনি স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে প্রেরণা হয়েছে অনেক কবিতার। রবীন্দ্রনাথের গানে লালনগীতির কথা ও সুরের প্রভাব ও সাদৃশ্য দুর্লক্ষ্য নয়। তাঁর বাউলাঙ্গের গানে লালনের গানের ভাব-ভাষা-ভাবনার আভাস চোখ এড়িয়ে যায় না। ‘রবীন্দ্রবাউলে’র এইসব গানের বিশেষ বিশেষ শব্দ, রূপক, প্রতীক, উপমা, চিত্রকল্প, ভাব ও সুর কখনো আংশিক আবার কখনো বা পরোক্ষ উপায়ে লালনের গান থেকে গৃহীত। হয়তো এ-সব কারণেই সাহিত্য সম্পর্কে ধারণাহীন নিরক্ষর লালনশিষ্যেরা ‘কবিগুরুকে লালনের চেলা বলিয়া মনে করে এবং বলে যে, কবিগুরু লালনের গানকে রূপান্তরিত করিয়াই জগৎ-জোড়া নাম কিনিয়াছেন’ (আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত: লালন স্মারকগ্রন্থ। মতিলাল দাশঃ ‘লালন ফকিরের গান’। পূর্বোক্ত; পৃ. ৩৭)।

রবীন্দ্রনাথের নাটকেও বাউলভাবনার অন্তরঙ্গ পরিচয় মেলে। তাঁর রূপক ও সাংকেতিক প্রায় সব নাটকেই বাউল-চরিত্র সংযোজন করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একটি নাটকে লালনীয় প্রভাবে বাউলের তত্ত্বদর্শনের সার্থক প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। জানা যায়ঃ

….বাউলতত্ত্বের উপর তিনি সে যুগের তাঁর একটি শ্রেষ্ঠ নাটক রচনা করেছিলেন, তার নাম ‘রাজা’। বৌদ্ধ আখ্যান থেকে তিনি ‘রাজা’ নাটকের কাহিনী গ্রহণ করেছেন, কিন্তু বাংলার বাউলের ভাবটি তার উপর আরোপ করে নিয়ে তাঁকে অনবদ্য সৃষ্টিরূপে গড়ে তুলেছেন। একটি বাউলগানে আছে, ‘সে যে কথা কয় দেখা দেয় না’; এই ভাবটিকেই তিনি বৌদ্ধ আখ্যায়িকাটির ভেতর দিয়ে প্রকাশ করে তার মধ্য দিয়ে নিজের অধ্যাত্ম ধ্যান-ধারণার পরিচয় প্রকাশ করেছেন (আশুতোষ ভট্টাচার্য : রবীন্দ্রনাথ ও লোক-সাহিত্য। কলকাতা, অগ্রহায়ন ১৩৮০; পৃ. ২৭৭-২৮)।

‘কে কথা কয় রে দেখা দেয় না’ – লালনের এই প্রাতিস্বিক গানের ভাব-সত্যকে তিনি তাঁর রাজা নাটকে রূপায়িত করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ছিলেন শক্তিমান, সচেতন, অসামান্য এক শিল্পী-পুরুষ। তাই তিনি লালনের বাণী ও সুরকে ভেঙে ‘আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন, যা একান্তই রবীন্দ্রবাউলের রচনা । রবীন্দ্রনাথের মরমি মানসে লালন ছিলেন প্রেরণার এক স্বতঃস্ফূর্ত উৎস।

৬.

জমিদারি রিচালনার সূত্রে শিলাইদহে এসে  রবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন বাউল-ফকির ও বৈষ্ণব-বৈষ্ণবীর সংস্পর্শে আসেন। এখানেই বাউলগানের সঙ্গে তাঁর অন্তরঙ্গ পরিচয় ঘটে। শিলাইদহে গগন হরকরা, গোঁসাই রামলাল, গোঁসাই গোপাল, সর্বক্ষেপী বোষ্টমী ও লালনের শিষ্য-সম্প্রদায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখা- সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এঁদের কাছে লালনের গান বিশেষভাবে শোনার সুযোগ তিনি লাভ করেন। লালনের গানের সহজ-সরল সুর ও উচ্চাঙ্গের তত্ত্বকথা তাঁকে মুগ্ধ ও আকৃষ্ট করে। অবশ্য ঠাকুরপরিবারে লালনের নাম অজ্ঞাত ছিল না। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলা দেবী, ইন্দিরা দেবী – এরা কেউ কেউ লালনের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন – কেউ লালনের ছবি এঁকেছেন – কেউ বা লালনের গানের স্বরলিপি করেছেন – গান সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন। এই তালিকায় রবীন্দ্রনাথের নামও অনিবার্যভাবে যুক্ত। প্রকৃতপক্ষে সব মিলিয়ে লালনচর্চায় তাঁর ভূমিকাই প্রধান বলে বিবেচনা করতে হয়।

১৩২২-এর আশ্বিন সংখ্যা প্রবাসীর ‘হারামণি’ বিভাগে প্রথম রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের পূর্ণাঙ্গ গান প্রকাশিত হয়। তবে এর আট বছর আগে প্রথম লালনের গানের উল্লেখ করেন ভাদ্র ১৩১৪-এর প্রবাসী পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত তাঁর গোরা উপন্যাস:

আলখাল্লা-পরা একটি বাউল নিকটে দোকানের সামনে দাঁড়াইয়া গান গাহিতে লাগিল:

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়

ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতেম পাখির পায়।

গোরা উপন্যাসের বিনয়ের আলস্যবশত বাউলকে ডেকে এলে এই গানটি লিখে নেওয়া হলো না, কিন্তু ‘এ অচেনা পাখির সুরটা মনের মধ্যে গুণ গুণ করিতে লাগিল’।

এই একই গানের উল্লেখ মেলে জীবনস্মৃতি (১৩১৯) গ্রন্থের ‘গান সম্বন্ধে প্রবন্ধ’ অধ্যায়ে । প্রথম দু’টি পংক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন:

দেখিলাম, বাউলের গানও ঠিক ওই একই কথা বলিতেছে। মাঝে মাঝে বদ্ধ খাঁচার মধ্যে আসিয়া অচিনপাখি বন্ধনহীন অচেনার কথা বলিয়া যায়; মন তাহাকে চিরন্তন করিয়া ধরিয়া রাখিতে চায়, কিন্তু পারে না। এই অচিন পাখির যাওয়া আসার খবর গানের সুর ছাড়া আর কে দিতে পারে (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: জীবনস্মৃতি। চ-স: কলকাতা, বিশ্বভারতী, জৈষ্ঠ্য ১৩৬৮, পৃ ১১৫)।

১৯২৫ সালে ভারতীয় দর্শন মহাসভার অধিবেশনে ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক সভাপতির ভাষণে তিনি আবার এই ‘অচিন পাখি’র গানের প্রসঙ্গ টানেন। লালনের এই গানটির সঙ্গে তিনি ইংরেজ কবি শেলির কবিতার তুলনা করে শিরোপা দেন বাংলার নিরক্ষর মরমি গ্রাম্যকবিকেইঃ

That this unknown is the profoudest reality, though difficult of comprehension, is equally admitted by the English poet as by the nameless village singer of Bengal, in whose music vibrate the wing-beats of the unknown bird, only Shelley’s utterance is for the cultural few, while the Baul Song is for the tillers of the soil, for the simple folk of our village households, who are never bored by its mystic transcendentalism.

এরপর ১৩৪১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পঠিত ‘ছন্দের প্রকৃতি’ শীর্ষক প্রবন্ধে, যা পরে ছন্দ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়, রবীন্দ্রনাথ লালন ফকিরের দু’টি সম্পূর্ণ গান ও একটি গানের অংশবিশেষ উদ্ধৃত করে এর ছন্দ-সুষমার প্রশংসা করতে দ্বিধা করেন নি:

প্রাকৃত-বাংলার দুয়োরাণীকে যারা সুয়োরাণীর অপ্রতিহত প্রভাবে সাহিত্যের গোয়ালঘরে বাসা না দিয়ে হৃদয়ে স্থান দিয়েছে সেই ‘অশিক্ষিত’-লাঞ্ছকধারীর দল যথার্থ বাংলাভাষার সম্পদ নিয়ে আনন্দ করতে বাধা পায় না। তাদের প্রাণের গভীর কথা তাদের প্রাণের সহজ ভাষায় উদ্ধৃত করে দিই।

আছে যার মনের মানুষ আপন মনে

সেকি আর জপে মালা

নির্জনে বসে বসে দেখছে খেলা। …

আর-একটি

এমন মানব জনম আর কি হবে।

যা কর মন ত্বরায় কর

এই ভবে।…

এই ছন্দের ভঙ্গি একঘেঁয়ে নয়। ছোট-বড়ো নানাভাগে বাঁকে বাঁকে চলেছে। সাধুপ্রসাধনে মেজেঘষে এর শোভা বাড়ানো চলে, আশা করি এমন কথা বলবার সাহস হবে না কারো (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: ছন্দ। পরিবর্ধিত সং: কলকাতা, বিশ্বভারতী, নভেম্বর ১৯৬২; পৃ. ১২৯-৩০)।

এই একই প্রবন্ধের অন্যত্র তিনি ‘বাঙালির দিনরাত্রির ভাষা’র নিদর্শন হিসেবে লালনের ‘কোথা আছে রে দীনদরদী সাঁই’ গানটির আংশিক উদ্ধৃত করেন।

৭.

শিলাইদহে অবস্থানকালেই রবীন্দ্রনাথ লালনের গান সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর জবানি থেকেই জানা যায়, ‘বাউলের গান শিলাইদহে খাঁটি বাউলের মুখে শুনেছি ও তাদের পুরাতন খাতা দেখেছি (নন্দগোপাল সেনগুপ্ত: পূর্বোক্ত, পৃ. ১০০)। জনশ্রুতি আছে, তিনি ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের খাতা আনিয়ে ঠাকুর এস্টেটের কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্যকে দিয়ে ২৯৮টি গান নকল করিয়ে নেন। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহজীবনের ভাষ্যকার শচীন্দ্রনাথ অধিকারী বলেছেন, ‘মরমি পল্লীকবি লালন সাঁই-এর সমস্ত গানের নকলও বামাচরণবাবু করেন (শচীন্দ্রনাথ অধিকারী : শিলাইদহ ও রবীন্দ্রনাথ। কলকাতা, মাঘ ১৩৮০; পৃ. ২০৬)। এক পত্রে (৩০.৯.১৯৭০) এ বিষয়ে বর্তমান সংকলক- সম্পাদককে শচীন্দ্রনাথ একটু বিশদ করে জানিয়েছিলেন :

লালন ফকিরের খেরোবাঁধা গানের খাতা চেয়ে নিয়ে কবি কতকগুলো গান নির্বাচিত করে পৃথক একখানা খাতায় ঐ রসিক বামাচরণবাবুকেই নকল করতে দেন। ঐ খাতাখানি শান্তিনিকেতনে ‘রবীন্দ্রভবনে’ সংরক্ষিত আছে। আমি সেটা দেখেছি এবং বাউলসঙ্গীত ও ধর্মের গবেষক উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে দেখিয়েছি (আবুল আহসান চৌধুরীঃ কুষ্টিয়ার বাউলসাধক। কুষ্টিয়া, পৌষ ১৩৮০, পৃ. ৪৯)।

কিন্তু ‘রবীন্দ্রভবনে’ রক্ষিত খাতার সংখ্যা এক নয় – দুই এবং অসংখ্য অশুদ্ধ বানানে পূর্ণ খাতা দু’টি ‘একটু শিক্ষিত’ বামাচরণ ভট্টাচার্যের নকলকৃত হওয়া অসম্ভব। কেননা শচীন্দ্রনাথই জানাচ্ছেন:

বামাচরণ ভট্টাচার্য বলে আর একজন আমলা ছিলেন, তিনি একটু শিক্ষিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গেও রবীন্দ্রনাথ অনেক বিষয় আলোচনা করে বুঝলেন – এ ব্যক্তি ছড়া, পাঁচালি, লোকপ্রবাদ প্রভৃতির ভক্ত। বামাচরণবাবুকে রবীন্দ্রনাথ ঐ রকম ছড়া, পাঁচালি প্রভৃতি সংগ্রহের ভার দেন। আমি বামাচরণবাবুর কাছে মাঝে মাঝে পড়তে যেতাম (শচীন্দ্রনাথ অধিকারী: পূর্বোক্ত, পৃ. ২০৫)।

আর তা-ছাড়া ‘রবীন্দ্রভবনে’র খাতা দু’টির হস্তাক্ষর যে লালনশিষ্য মনিরুদ্দীন শাহের, তার প্রমাণ মেলে মনিরুদ্দীন-লিপিকৃত প্রাপ্ত একাধিক খাতার হাতের লেখার মিল থেকে।

৮.

প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের দু’টি খাতা সংগ্রহ করেছিলেন হয়তো অনুলিপি করিয়ে ফেরত দেওয়ার শর্তে। যে-কোন কারণেই হোক খাতার অনুলিপিও হয় নি এবং তা ফেরতও যায় নি আখড়ায় । পরে ‘Songs of Lalon Fakir Collected by Rabindranath’ খাতার আখ্যাপত্রে এই কথাগুলো লিখিত হয়ে খাতা দু’টি স্থান পায় ‘রবীন্দ্রভবনে’। জমিদারি পরিচালনা সূত্রে শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের অবস্থিতিকাল ১৮৯০ থেকে ১৯২২ পর্যন্ত। খাতা দু’টি তিনি কোন সময়ে সংগ্রহ করেছিলেন, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে লালনের শিষ্যভক্তেরা সেই ভোলাই শাহের আমল থেকেই বরাবর অভিযোগ করে আসছেন যে রবীন্দ্রনাথ লালনের গানের খাতা নিয়ে বিয়ে আর ফেরত দেন নি ।

আগেই বলেছি লালনের গানের লিপিকর ছিলেন তার দুই শিষ্য মনিরুদ্দীন শাহ ও মানিক শাহ। দ্বিতীয়জনের লিপিকৃত কোন খাতার সন্ধান মেলে নি। তবে মনিরুদ্দীনের হস্তলিখিত লালনের গানের একাধিক খাতার অস্তিত্ব ছিল এবং আছে। তাই ক্ষেত্রে ‘আদি’ বা ‘আসল খাতা’ কোনটি তা চিহ্নিত করা মুশকিল, কেননা এই খাতাগুলোয় লিপিকালের কোন উল্লেখ নেই। তাই রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের খাতা নকলকৃত একাধিক খাতারই অন্যতম জোড়া-খাতা বলে মনে করা যেতে পারে।

লালনের গানের খাতা-রহস্য নিয়ে নানা কৌতূহল জাগানো কথা আছে। এই রহস্য তৈরিতে লালন শিষ্যদেরও কিছু ভূমিকা আছে বলে জানা যায়। যাঁরা ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালনের গানের খাতা সন্ধান করেছেন তাঁদের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য এ-সম্পর্কে আমলে নিতে হয়। ১৯৩৫-৩৬ সাল নাগাদ অন্নদাশঙ্কর রায় কুষ্টিয়ার মহকুমা হাকিম ছিলেন। সেই সময়ে কুষ্টিয়ায় দ্বিতীয় মুনসেফ হিসেবে কর্মরত ছিলেন মতিলাল দাশ। লালন সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল। কুষ্টিয়ার পাক্ষিক দীপিকা পত্রিকার পরিচালক আইনজীবী দেবেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৌজন্যে ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় গিয়ে লালনের গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। আখড়ার তত্ত্বাবধায়ক তখন লালনশিষ্য ভোলাই শাহ। মতিলাল দাশ লালনের গানের খাতা দেখতে চাইলে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয় সে সম্পর্কে তিনি জানিয়েছেন :

ভোলাই সার নিকট হইতে গানের পুঁথি আদায় করিতে যথেষ্ট বেগ পাইতে হইয়াছিল। ভোলাই সা বলিল, “দেখুন, রবিঠাকুর আমার গুরুর গান খুব ভালবাসিতেন, আমাদের খাতা তিনি লইয়া গিয়াছেন, সে খাতা আর পাই নাই, কলিকাতা ও বোলপুরে চিঠি দিয়াও কোনও উত্তর পাই নাই।” … ভোলাই কবিগুরুকে লালনের চেলা বলিয়া মনে করে এবং বলে যে, কবিগুরু লালনের গানকে রূপান্তরিত করিয়াই জগৎ-জোড়া নাম কিনিয়োছেন। …. সে যাহা হউক, বৃদ্ধের অনেক স্তুতি করিয়া কোনও ক্রমে একটি গানের নকল-পুঁথি যোগাড় করিলাম।

নকল-পুঁথির বানান অনেক ভুল, তাহাকে সংশোধন করিয়া তুলিয়া দিলাম …(আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত: লালন স্মারকগ্রন্থ। পূর্বোক্ত, পৃ. ৩৭-৩৮)।

বাউলধর্মের তত্ত্ব, ইতিহাস, সাধনা, দর্শন ও সংগীত নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। লালনের খাতা ও গান সংগ্রহে তাঁর প্রয়াসের প্রসঙ্গও জানা আবশ্যক, তাতে এ-বিষয়ে নেপথ্য- কথাও প্রকাশ পায়। উপেন্দ্রনাথ বলেছেন:

১৯২৫ সালে … বিখ্যাত লালনশাহী মতের ফকির হীরু শাহের সঙ্গে … লালনের সেঁউড়িয়া আখড়ায় উপস্থিত হই। ঐ দিন ছিল আখড়ার বাৎসরিক উৎসব। …. ঐ উৎসবে ফকিরদের মুখে শুনিয়া কতকগুলি গান লিখিয়া লই। উহাই আমার লালনের গান সংগ্রহের প্রথম প্রচেষ্টা।

ঐ সময়ে আশ্রমে রক্ষিত একখানা পুরানো গানের খাতা দেখি। উহা নানাপ্রকারের ভুলে এমন ভর্তি যে, প্রকৃত পাঠোদ্ধার করা বহু বিবেচনা ও সময়সাপেক্ষ। আশ্রমের কর্তৃপক্ষেরা বলে যে, সাঁইজীর আসল খাতা শিলাইদহের ‘রবিবাবু মশায় লইয়া গিয়াছেন। …. লালনের শিষ্যেরা আবার সেই গানগুলি বর্তমান খাতায় লিখিয়া রাখিয়াছে। তাহারা আরো বলে যে, সাঁইজীর সেই গানের খাতা পাইয়াই রবীন্দ্রনাথ অত বড়ো কবি হইয়া সকলের প্রশংসা লাভ করিয়াছেন।….

তারপর ১৯৩৬ সাল হইতে কুষ্টিয়ায় যখন স্থায়িভাবে বাস করিতে আরম্ভ করি, তখন লালনের সমস্ত গান পূর্ণাঙ্গ ও শুদ্ধরূপে প্রকাশ করিতে চেষ্টা করি। তখন ঐ খাতাখানি আর একবার দেখিবার প্রয়োজন হইলে আখড়ার তদানীন্তন মালিক ভোলাই শা ফকির বলে যে ঐ খাতা মুন্সেফ মতিলালবাবু লইয়া গিয়াছেন, তিনি উহা দেখিতে লইয়া আর ফেরত দেন নাই। … মতিলালবাবু যে খাতা লইয়া যান নাই, সে সেই খাতা লালনের আস্তানাতেই আছে, তাহার প্রমাণ শীঘ্রই পাওয়া গেল। যাহোক, সেই খাতা চাহিবার  আবার সুযোগ মিলিল। তখন সেই খাতার সহিত মিলাইয়া শুদ্ধ আকারে দুইশতের কিছু অধিক গান সংগ্রহ করিয়া রাখি। … এই খাতা যে নানাপ্রকারের ভুলে ভর্তি ও তাহার পাঠোদ্ধার সহজসাধ্য নয়, তাহা শ্রীমতিলাল দাস মহাশয়ও বলিয়াছেন লালন সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধে (বসুমতি, শ্রাবণ ১৩৪১) (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য । পূর্বোক্ত, পৃ. ৫৩৩-৩৪)।

এরপর উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ‘রবীন্দ্রভবনে’ সংরক্ষিত রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের খাতা সম্পর্কে তাঁর সরেজমিন প্রতিবেদনে বলেছেন:

দেশবিভাগের পর কলিকাতায় আসিয়া কোনো এক সূত্রে খবর পাই যে, রবীন্দ্রনাথের পুরানো কাগজপত্রের মধ্যে লালন ফকিরের গান সম্বলিত একখানা খাতা পাওয়া গিয়াছে। ঐ খাতা শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে আছে। তখন মনে হইল ইহাই বোধহয় সেই বহু-শ্রুত, বহু-কথিত ‘সাঁইজীর আসল খাতা’। সেই খাতা দেখিবার উদ্দেশ্যে আমি ১৯৪৯ সালে শান্তিনিকেতনে যাই ।

আমার সঙ্গে গিয়াছিলেন পল্লীগীতির অকৃত্রিম ভক্ত শচীন্দ্রনাথ অধিকারী মহাশয়। রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ শ্রী প্রবোধচন্দ্র সেন মহাশয়ের সৌজন্যে খাতাখানা হস্তগত হইলে দেখা গেল, ইহা সেই নানাপ্রকারের ভুলের নমুনাভরা লালনের আখড়ার খাতাখানির একটি কপি । বিশেষ মনোযোগের সঙ্গে দেখিলাম, ইহার মধ্যে লালনের অনেক সুপরিচিত গান নাই। বেশ বুঝা গেল, ‘আসল খাতা’ সেই একমাত্র খাতা যাহার নকল রবীন্দ্রনাথ লইয়াছেন, যাহা মতিলাল দাস মহাশয় দেখিয়াছিলেন এবং যাহা আমি কয়েকবার দেখিয়াছি। শচীন্দ্রবাবু বলিলেন এই হাতের লেখা তিনি ভালোরূপ চিনেন, ইহা শিলাইদহের ঠাকুর এস্টেটের এক পুরাতন কর্মচারী বামাচরণ ভট্টাচার্যের। … অতএব মনে হয় যে, রবীন্দ্রনাথ লালনের আখড়া হইতে খাতাখানি সংগ্রহ করিয়া তাঁহার এক কর্মচারীকে দিয়া নকল করাইয়া লন, পরে উহা হইতে শুদ্ধ করিয়া কতকগুলি গান প্রবাসীতে প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরিয়া রবীন্দ্রনাথের আসল খাতা লইয়া যাওয়ার যে গল্প চলিয়া আসিতেছিল, তাহার মূলে যে বিশেষ কিছু নাই, … এবারে নিঃসন্দেহ হইলাম (ঐ; পৃ. ৫৩৬-৩৭)।

এখানে বলা প্রয়োজন যে, খাতা ও তার হস্তাক্ষর সম্পর্কে শচীন্দ্রনাথ অধিকারীর সাক্ষ্য ও উপদ্ৰেনাথ ভট্টাচার্যের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। খাতার হস্তাক্ষর বামাচরণ ভট্টাচার্য নয়, লালনশিষ্য মনিরুদ্দীন শাহের। আর মনিরুদ্দীন শাহ লালনের গানের একাধিক খাতা প্রস্তুত করেছিলেন, তাই ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় রক্ষিত খাতাই ‘আসল’ কিংবা ‘একমাত্র খাতা’ নয়। রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত খাতা থেকে রবীন্দ্রনাথ ‘হারামণি’ বিভাগে প্রকাশের জন্যে কুড়িটির মধ্যে মাত্র আটটি গান নিয়েছিলেন।

লালনের গানের খাতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লালনের শিষ্যভক্তদের কাছে অভিযুক্ত হয়েছিলেন দুইভাবে ১. ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে খাতা সংগ্রহের পর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তিনি আর তা ফেরত দেন নি এবং ২. …. রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে লালনের গানের পুঁথিই সুকৌশলে গীতাঞ্জলিতে রূপান্তরিত হয়। সুতরাং কবিগুরুর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তি তথা বিশ্বজোড়া খ্যাতির মূলে বাংলার বাউল লালন সাঁই (অন্নদাশঙ্কর রায় : পূর্বোক্ত, পৃ. ৪২)। লালনের শিষ্যভক্তেরা তাঁর গানের খাতা উদ্ধারে সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করেই ব্যর্থ হন। ব্যক্তিগত দেন-দরবার, চিঠিপত্র লিখে অনুরোধ-পেশ, এমন কী মহকুমা হাকিমের কাছেও তাঁরা আর্জি পেশ করেছিলেন। অন্নদাশঙ্কর রায় যখন কুষ্টিয়ার মহকুমা প্রশাসক তখন লালনের গানের ‘আসল পুঁথিখানি’ ‘কবিগুরুর কাছ থেকে উদ্ধার করতে সাহায্য’ করার জন্যে কাঙাল হরিনাথের জ্ঞাতি ভ্রাতুষ্পুত্র ও লালন অনুরাগী ভোলানাথ মজুমদার তাঁকে অনুরোধ জানান (ঐ; পৃ. ৪২)। খাতা সম্পর্কে যে রহস্য বা ধন্দ সৃষ্টি হয়েছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে একটি নয় দু’টি খাতা সংগ্রহ করেছিলেন এবং তা ‘আদি’ বা ‘আসল’ নয় মনিরুদ্দীন শাহ অনুলিপিকৃত একাধিক খাতার মধ্যের দুটি খাতা। আর বামাচরণ ভট্টাচার্যকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যদি লালনের গান নকল করিয়েও থাকেন সে খাতার হদিশ এখনো মেলে নি।

৯.

৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের তৎকালীন আধিকারিক ডক্টর পশুপতি শাশমল বর্তমান সংকলক-সম্পাদককে লালন স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা, চৈত্র ১৩৮০)-এর জন্যে রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত লালন- পাণ্ডুলিপির কয়েক পৃষ্ঠার আলোকচিত্র এবং পাণ্ডুলিপির একটি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রেরণ করেন। উক্ত বিবরণীটি নিম্নরূপ:

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট থেকে প্রাপ্ত রবীন্দ্রভবনস্থ পাণ্ডুলিপির মধ্যে লালন ফকিরের গানের খাতা দু’টি বিশেষ উল্লেখযোগ্য, এদের পরিগ্রহণ সংখ্যা: ১৩৮ (এ)-১ এবং ১৩৮(এ)-২। দু’টি খাতারই আখ্যাপত্রে পেন্সিলে লেখা পাওয়া যায়: Songs of Lalan Fakir – Collected by Rabindranath.

খাতার পিছন দিক থেকে লেখা শুরু হয়েছে, অর্থাৎ প্রচলিত অর্থে শেষ পৃষ্ঠাকে (বাঁ দিকের পৃষ্ঠা) আখ্যাপত্র করা হয়েছে। সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে লাইন টেনে বেশ স্পষ্ট হস্তাক্ষর কালিতে গানগুলো লেখা। লাল পেন্সিলে পৃষ্ঠাঙ্ক দেওয়া আছে। লিখিত পৃষ্ঠার সংখ্যা সর্বমোট ১৬৩ (১ম খাতা – ৬৮; ২য় খাতা-৯৫)। মোট গানের সংখ্যা ২৯৮। দু’টি খাতার আয়তন ১৭ সেঃমিঃ x ২১ সেঃমিঃ (বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনের ভারপ্রাপ্ত আধিকারিক ডক্টর পশুপতি শাশমল প্রেরিত ‘রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত লালন-পাণ্ডুলিপির বিবরণ’ (নির্দেশক সংখ্যা-র/৯০৪ তাং ৯.২.১৯৭৪)। আলোচ্য লালনের গানের প্রথম খাতায় ১২৬ ও দ্বিতীয় খাতায় ১৭২টি গান সংকলিত হয়েছে। ৮টি গান দু’বার লিখিত, সেই হিসেবে গানের প্রকৃত সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯০ (রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী: কয়েকজন লোককবি এবং প্রসঙ্গত। ঢাকা, আষাঢ় ১৩৯৯; পৃ. ২৬)। আবার সনৎকুমার মিত্রের হিসেবে এই দু’টি খাতায় গানের মোট সংখ্যা ২৯৭, এর মধ্যে ১২টি গানের পুনরাবৃত্তি ঘটায় গানের সংখ্যা ধরতে হয় ২৮৫। (সনৎকুমার মিত্র : লালন ফকির : কবি ও কাব্য। কলকাতা, ঝুলনযাত্রা ১৩৮৮; পৃ. ১০৮)।

ছবিঃ ফকির ভোলাই শাহ এর খাতার প্রচ্ছদে লেখা আছে ‘শ্রী লালন সাঁই দরবেশের তালেব শ্রী ভোলাই শাহ ফকির এই বহির মালিক’

রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত লালনের গানের খাতায় রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি ক্ষেত্রে স্বহস্তে সংশোধন করেছেন। প্রথম খাতার কোন গান তিনি সংশোধন না করলেও ‘দ্বিতীয় খাতায় ১০৪, ১০৬ ও ১২১ সংখ্যক গান তিনটিতে পাঁচটি জায়গায় কয়েকটি শব্দ কবি স্বহস্তে কেটে তার মাথায় শুদ্ধ পাঠ লিখে রেখেছেন (রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরী। পূর্বোক্ত, পৃ. ২৭)। রবীন্দ্রনাথ- সংগৃহীত লালনের গানের খাতার একটি বর্ণানুক্রমিক সূচি প্রকাশ করেন চিত্তরঞ্জন দেব (পরিচয় : চৈত্র ১৩৬৪)। এই সূচির ভূমিকায় তিনি উল্লেখ করেছেন : ‘মূল খাতায় যেরূপ বানান রয়েছে সংশোধন না করে খাতার অনুরূপ বানানই এই তালিকাতেও রাখা হল’ (চিত্তরঞ্জন দেব : ‘রবীন্দ্রনাথের সংগ্রহ: লালন ফকিরের গান। পরিচয় চৈত্র ১৩৬৪; পৃ. ৮৯২)। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তা হয় নি। কমপক্ষে প্রায় ৫০টি গানের সূচিতে কোন না কোনভাবে মূলের ব্যত্যয় ঘটেছে। সনৎকুমার মিত্র এই গানের খাতার ‘মূল বানানের অশুদ্ধ রূপ অবিকৃত রেখে’ হুবহু ২৮৫টি গান প্রকাশ করেন তাঁর লালন ফকির : কবি ও কাব্য (কলকাতা, ১৩৮৬) গ্রন্থে। কিন্তু তাঁর এই দাবিও পুরোপুরি সঠিক নয়। পাঠোদ্ধার করতে না পারায় বেশ কিছু গানে খাতার বানানের সঙ্গে পার্থক্য আছে। এই খাতার আলোকচিত্র-প্রতিলিপি প্রথম মুদ্রিত হয় আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত লালনের দ্বিশত জন্মবর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত লালন স্মারকগ্রন্থ (ঢাকা, চৈত্র ১৩৮০)-এ।

১৩২২ সালের আশ্বিন থেকে মাঘ পর্যন্ত (কার্তিক সংখ্যা বাদে) চার কিস্তিতে রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের মোট কুড়িটি গান প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে মাত্র আটটি রবীন্দ্রভবনের খাতা থেকে গৃহীত। এ-থেকে ধারণা হয় রবীন্দ্রনাথ নিশ্চয়ই অন্য সূত্র অর্থাৎ ভিন্ন খাতা, লালনশিষ্য কিংবা শিলাইদহের বাউলদের নিকট থেকেও লালনের গান সংগ্রহ করেছিলেন। কিছুকাল আগে লালন গবেষক শক্তিনাথ ঝা ১২৯৯ সালে লিপিকৃত লালনের গানের একটি খাতা উদ্ধার ও প্রকাশ করেছেন(শক্তিনাথ ঝা : ফকির লালন সাঁই : দেশকাল এবং শিল্প। কলকাতা, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৫)। তাঁর অনুমান, জগৎ বিশ্বাস লিপিকৃত লালন শিষ্য ভোলাই শাহের স্বত্ত্বাধীন এই খাতাটি নাকি দীর্ঘকাল রবীন্দ্রনাথের কাছে ছিল এবং প্রবাসীর ‘হারামণি’ বিভাগে রবীন্দ্রনাথ লালনের যে গান প্রকাশ করেন তা এই খাতে থেকেই গৃহীত। এই খাতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় সম্পর্কে শক্তিনাথ ঝা-র মতো নিশ্চিত হয়ে অতখানি দৃঢ় বিশ্বাস আমরা নানা কারণে পোষণ করি না। আর খাতাটি আদৌ রবীন্দ্র পরিবার সংগৃহীত কি-না সে সম্পর্কে’ রবীন্দ্র-পরিবার কিংবা রবীন্দ্রভবন কর্তৃপক্ষেরই সন্দেহ ছিল – জানা যাচ্ছে খাতার শেষের পাতায় পেনসিলে লেখা আছে – ‘Ms of Baul Songs / (Collected by Tagore?) rare’ এ বিষয়ে আমরা পরে সময়-সুযোগমতো স্বতন্ত্রভাবে আলোচনা করবো । তবে লালনের এই গানের খাতাটি মূল্যবান ও প্রামাণ্য – সে মন্তব্যটুকু আপাতত করা যায়।

১০.

রবীন্দ্রভবনের লালনের গানের খাতা দু’টি অজস্র ভুল বানানে পূর্ণ। লিপিকরের বানান-জ্ঞান যে যথেষ্টই দুর্বল তাতে কোনো ভুল নেই। গান পরিবেশনে আঞ্চলিক উচ্চারণ ও কথ্যবুলিও এর অন্যতম কারণ হতে পারে। শুধু শব্দ নয়, ‘লালন’-এর নামটিও আঞ্চলিক উচ্চারণের ফলে ‘নালন’-এ রূপ নিয়েছে। এই অশুদ্ধির বিষয়ে রবীন্দ্রনাথও বিব্রত হয়েছিলেন। ‘The Philosophy of Our People’ শীর্ষক অভিভাষণে তিনি স্পষ্ট উল্লেখ করেছিলেন:

I remember how troubled they were, when I asked some of them to write down for me a collection of their songs. When they did venture to attempt it, I found it almost impossible to decipher their writing – the spelling and lettering were so outrageously unconventional.

এই খাতা বা অন্যখাতা এবং বাউলশিল্পীদের কাছ থেকে সরাসরি সংগৃহীত লালনের গান এ-যাবৎ যাঁরা প্রকাশ করেছেন, তাঁরা প্রায় সকলেই তা সংশোধনের আশ্রয় নিয়েছেন। উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লালনের গানের সম্পাদনা প্রসঙ্গে যুক্তি দেখিয়েছেন:

এই গানগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীর রচনা। অনেকস্থলে তৎসম শব্দের বানান ঠিক করিতে না পারায় অশুদ্ধ উচ্চারণ অনুযায়ী বানান লিখিত ঠিক হইয়াছে। বাগধারা ও অনেক ক্রিয়াপদ কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাধারণের চলিত ভাষার অনুরূপ। অজ্ঞতার জন্য যে শব্দগুলি বিকৃতভাবে উচ্চারিত বা লিখিত হইয়াছে, সেইগুলি সেইরূপই রাখা অর্থহীন। সেইজন্যই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ ঐ গানগুলি শুদ্ধ উচ্চারণ অনুযায়ী বানান ঠিক করিয়া প্রকাশ করিয়াছিলেন। আমি রবীন্দ্রনাথের পন্থা অনুসরণ করিয়াছি (উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য : পূর্বোক্ত ৫৩৭)।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত লালন-গীতিকায় মতিলাল দাশের সংগ্রহের সঙ্গে রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত লালনের খাতার ৮৯টি গানও শামিল করা হয়। লালন-গীতিকায় ‘যথা সম্ভব বিশুদ্ধ পাঠ প্রতিষ্ঠিত করা’র জন্যে যেগুলি অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই বিকৃতি বা অশুদ্ধি বলিয়া মনে হইয়াছে সেইগুলিই শুদ্ধ করিয়া গানগুলিকে বোধ্যগম্য করিয়া তুলিবার চেষ্টা হইয়াছে’ (মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্র সম্পাদিত: লালন-গীতিকা। পূর্বোক্ত; পৃ. ভূমিকা নয়)। ভূমিকায় শশিভূষণ দাশগুপ্ত আরো লিখেছেন:

‘রবীন্দ্র সদনে’ রক্ষিত গানের খাতা উর্দুর ন্যায় ডান দিক্ হইতে বাঁ দিকে লিখিত; খাতার শেষ পৃষ্ঠাই প্রথম পৃষ্ঠারূপে গণ্য। এই খাতার পাঠে আবার আর একটি বৈশিষ্ট্য লক্ষিত হয়; ক্রিয়াপদের আদিতে আ-কার স্থানে স্থানে এ-কার রূপে লিখিত; যেমন, রাখলে রেখলে; জানতে– জেনতে, ভাসতে – ভেসতে। মতিলালবাবুর খাতায় এগুলি আ-কারান্তভাবেই লিখিত। এ-জাতীয় শব্দগুলিকে সাধারণত আ-কারান্ত রূপেই দেওয়া হইয়াছে (ঐ; পৃ. ভূমিকা-নয়)।

মোটের উপর এ-যাবৎ লালনের গানের আদিরূপ যা-ই থাকুক না কেন, প্রকাশের সময় তার মৌলিকত্ব আর বজায় থাকে নি, তা যথেষ্ট পরিমাণে সংশোধিত ও পরিমার্জিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের খাতা সম্পর্কেও এ-কথা প্রযোজ্য। এই সংশোধন-প্রক্রিয়া ফোকলে সংগ্রহ-সম্পাদনা প্রকাশনার বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি ও রীতিপদ্ধতির দিক থেকে কতখানি সঙ্গত ও প্রয়োজনীয়, সে-প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

১১.

রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত লালনের খাতার গান প্রকাশ করে সনৎকুমার মিত্র গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। গানগুলো সম্পাদনা করতে গিয়ে তিনি ‘যে পদগুলি বানান বিভ্রাট কারণে দুরূহ রূপ নিয়েছে ‘তার শুদ্ধরূপ’ নির্দেশ করেছেন পরিশিষ্টে তাও প্রয়োজনীয় স্বীকার করতে হয়।

কিন্তু তিনি যখন বলেন : *আমার যুক্তি-ঋদ্ধ প্রত্যয় [ বিশ্বাস নয় ] যে, এই গানগুলিই লালন রচনা করেছিলেন। বাকী সবই ভেজাল। এর বাহিরে যা চলে, চলছে এবং চলবে সেগুলি হচ্ছে ‘স্বরচিত লালন-গীতি’, (সনৎকুমার মিত্র : পূর্বোক্ত, পৃ. ১০৮) তখন বিস্মিত ও হতবাক হতে হয় প্রাজ্ঞ গবেষকের ‘যুক্তি-ঋদ্ধ প্রত্যয়’-এর নমুনা দেখে। তাঁর এই মন্তব্য হাস্যকর, তথ্য কল্পিত ও সিদ্ধান্ত নিতান্তই ভ্রান্ত। তাহলে তো ‘হারামণি’ বিভাগে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গান ‘জাল’ বা ‘ভেজাল’! মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, বসন্তকুমার পাল, মতিলাল দাশ, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য এমন কী হাল আমলের শক্তিনাথ ঝা এঁদের সংগৃহীত লালনের গানকে কী ‘স্বরচিত লালন-গীতি’ বিবেচনা করতে হবে? এঁদের পূর্বসূরিদের সংগৃহীত-প্রকাশিত লালনগীতিও তো তাহলে এই একই মানদণ্ডের বিচারে খারিজ করতে হয়! লালনের গানের আসল-নকল নিয়ে কথা আছে প্রশ্ন আছে – বিতর্ক আছে। লালনের খণ্ডিত, বিকৃত, জাল, নকল গান কেউ কেউ বিশেষ উদ্দেশ্যে সাধনের কারণে প্রচার-প্রকাশ করে থাকেন। এ-ক্ষেত্রে একধরনের নৈরাজ্য প্রচলিত থাকলেও, (আবুল আহসান চৌধুরী সংকলিত-সম্পাদিত: লালনসমগ্র। পূর্বোক্ত, পৃ. ২৭-২৯)। ড. মিত্রের যুক্তিহীন মন্তব্য ও তথ্যরিক্ত সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য।

১২.

কোন লোককবি সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার প্রধান উপকরণ তাঁর রচনা। এইসব রচনা কবির জীবিতকালে সচরাচর মুদ্রণভাগ্য লাভ করে না। ফলে আগ্রহী সংগ্রাহকদের প্রয়াসের ওপর নির্ভর করতে হয়। সংগ্রহ যদি সততা ও রীতি-পদ্ধতিমাফিক না হয়, প্রকাশকালে যদি রচনার মৌলিকত্ব ক্ষুণ্ণ হয়, – তবে ভ্রান্তি বাড়তেই থাকে, বিতর্ক ও মতভেদ হয়ে ওঠে প্রবল। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অনেকখানি নির্ভর করে শুদ্ধ ও সঠিক রচনাপ্রাপ্তির ফলে। লালনের গান সম্পর্কেও এই কথাটি প্রযোজ্য। তাই লালনের প্রামাণ্য গান সংগ্রহ ও প্রকাশ বিশেষ জরুরি। তবে সেই সংগ্রহের ভিত্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তি-সূত্র নয়, লালনের শিষ্য- প্রশিষ্যদের লিপিকৃত খাতা ও কমপক্ষে দেশভাগের আগে প্রকাশিত গানকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন । এই ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত গানের খাতা আদর্শ হতে পারে। এই ধরনের নির্ভরযোগ্য লিখিত উপকরণ হুবুহু প্রকাশিত হলে লালনের আসল গান যেমন প্রচারিত হবে, তেমনি লালনচর্চাও একটি সুষ্ঠু ধারায় প্রবাহিত হতে পারবে।

সাল-তারিখের হিসেবে লালনের গান প্রকাশের বয়স প্রায় ১২৪ বছর। প্রামাণ্য, বিকৃত, খণ্ডিত, জাল, নকল মিলিয়ে লালনের গীতি-সংকলনের সংখ্যা সম্ভবত পঞ্চাশ ছাড়িয়ে যাবে। লালনের গানের আসল-নকল বিচারের একটা বড়ো মাপকাঠি লালনের গানের প্রামাণ্য পুরনো খাতা। … আলেক সাঁই ।

 

আবুল আহসান চৌধুরী

বাংলা বিভাগ

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া বাংলাদেশ

[আবুল আহসান চৌধুরী এর সংগ্রহ-সংকলন-সম্পাদনা-ভূমিকায় “রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের পাণ্ডুলিপি” গ্রন্থটি পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত হয় । উক্ত গ্রন্থ থেকে ভূমিকা অবিকল অবিকৃতি রূপে ভক্ত/ অনুরাগী/ পাঠকের নিমিত্তে উপস্থাপন করা হল]

শেয়ার করুন:

অন্যান্য পোস্ট

ফকিরের ঘরের চাবি ডিসি সাবের হাতে – বিধুনন জাঁ সিপাই

#To Tarique Rahman মিস্টার প্রাইম মিনিষ্টার, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আপনাকে অভিবাদন জানাচ্ছে, দুর্গাপূজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য। এটা আনন্দের।   কিন্তু

বিস্তারিত

কাঙাল হরিনাথের লালন সাঁই ফকির

ম. মনিরুজ্জামান   অখণ্ড বাংলাদেশে উনিশ শতকে সংবাদ-সাময়িকীপত্র পরিচালনা করে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছিলেন কাঙাল হরিনাথ মজুমদার (১৮৩৩-৯৬)। তিনি থাকতেন কুমারখালীতে।

বিস্তারিত

You cannot copy content of this page

ভিক্ষার ঝুলি

ওয়েবসাইটের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখতে অনুদান পাঠাতে পারেন।

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫

 +৮৮০১৮৪৯৬১৫০৩৫-৫