কি শোভা দ্বিদল পরে
কি শোভা দ্বিদল পরে রস-মণিমাণিক্যে রূপ ঝলক মারে ।। অবিম্ব গম্ভুতে নিত্য স্ব গোলক বিরাজ করে তাহে পূর্ণ ব্রহ্মলোক হলে দ্বিদল নির্ণয়, শোব জানা যায় প্রসন্ধি থাকে না সাধনদ্বারে ।। শতদল সহস্র দলের দল রসবতি রূপে করে চলাচল দ্বিদলে স্থিতি বিদ্যুৎ আকৃতি ষড়দলে বারাম যোগান্তরে ।। ষড়দলে সেতো ষড়তত্ব হয় দশোমদলে মৃণালগতি গঙ্গা বয় ত্রিধারা তার, ত্রিগুনে বিচার লালন কয় গুরু অনুসারে ।।
কী সাধনে পাই গো তারে
কী সাধনে পাই গো তারে ব্রহ্মা বিষ্ণু ধ্যানে পায় না যারে ।। শুন্য শিখর যার নির্জন গুহা স্বরূপে সেই তো চন্দ্রের আভা সে আভা ধরতে চাই হাতে নাহি পাই কেমনে সে রূপ যায় গো সরে ।। জানে শাস্ত্র ভাল কেহ পঞ্চতাত্বিক হলে জানতে পায় সেহ পঞ্চতত্বের ঘর সেও তো অন্ধকার নিরপেক্ষ হয় সে বিচারে ।। গুরুপদে আজ হইত মরণ তবে বুঝি সফল হইত জীবন ভেবে বলে অধীন
কী সাধনে পাই গো তারে
কী সাধনে পাই গো তারে আমার মন অহর্নিশি চাই যারে ।। পঞ্চ প্রকার মুক্তির বিধি অষ্টাদশ প্রকারে সিদ্ধি তারে কয় হেতু ভক্তি এহার বাসনাই আলেক সাঁইজী মেরে ।। যজ্ঞ ব্রত তব জপ যত তাহাতে সাঁই হয় না রত সাধুশাস্ত্রে সদা তো মনে কোনটা জানি সত্য করে ।। ঠিক পড়ে না প্রবর্তের ঘর সে সাধন সিদ্ধি হয় কী প্রকার সিরাজ সাঁই কয় লালন তোমার নজর হয় না কিছুই
ক্ষ্যাপা না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায়
ক্ষ্যাপা না জেনে তোর আপন খবর যাবি কোথায় আপন ঘরে না খুঁজিয়ে বাইরে খুঁজলে পড়বি ধোঁকায় ।। আমি সত্য না হইলে গুরু সত্য হয় কোন কালে আমি যে রূপ দেখনা সেই রূপ দীন দয়াময় ।। আত্মারূপে সেই অধর অঙ্গ অংশ কলা রূপ তার ভেদ না জেনে বনে বনে করিলে কি হয় ।। আপনার আপনি না চিনে ঘুরবি কত এ ভুবনে লালন বলে অন্তিম কালে নাই রে উপায়
কোন সুখে সাঁই করেন খেলা এই ভবে
কোন সুখে সাঁই করেন খেলা এই ভবে আপনি বাজায় আপনি বাজে আপনি মজে সেই রবে ।। নাম শুনি লা-শারিকালা সবার শরিক সেই একেলা আপনি তরঙ্গ আপনি ভেলা আপনি খাবি খায় ডুবে ।। ত্রিজগতে সেই রাই রাঙ্গা তার দেখি ঘরখানি ভাঙ্গা হায় কি মজা আজব রঙ্গা দেখায় ধনী কোন ভাবে ।। আপনি চোর হয় আপন বাড়ি আপনি পড়ে আপন বেড়ি লালন বলে এই নাচারি কইনে থাকি চুপচাপে ।।
কী রূপ সাধনের বলে অধর ধরা যায়
কী রূপ সাধনের বলে অধর ধরা যায় নিগূঢ় সন্ধান জেনে শুনে সাধন করতে হয় ।। পঞ্চতত্ব সাধন করে পেত যদি সে চান্দেরে তবে বৈরাগ্যরা কেনে, আঁচল গুধরি টানে কুলের বাহির হয় তারা চরণ বাঞ্ছায় ।। বৈষ্ণবের সাধন ভাল তাই বলিয়ে ভক্তি ছিল ব্রহ্মজ্ঞানী যারা সদাই ভাবে তারা শাক্ত-বৈষ্ণবের নাই স্বয়ং পরিচয় ।। শুনে ব্রহ্মজ্ঞানীর বাক্য দরবেশে করে ঐক্য বস্তুজ্ঞান যার নাই নাম-ব্রহ্ম কি পায় লালন বলে দরবেশ
কোন সাধনে পাই গো তারে
কোন সাধনে পাই গো তারে আমার মন অহর্নিশি চায় যাহারে ।। হোম যজ্ঞ স্তব দান ব্রত ইহাতে সাঁই নাহি রত সাধুশাস্ত্রে কয় সদা তো বশ নাই আলেক সাঁইজি মেরে ।। পঞ্চ প্রকার মুক্তি বিধি আষ্টাদশ প্রকারে সিদ্ধি এই সকল হয় হেতু ভক্তি সাঁই আমার কোনটা যেন সত্য করে ।। ঠিক পড়ে না প্রবর্তের ঘর সাধনসিদ্ধি হয় কীসের পর সিরাজ সাঁই কয় লালন তোমার নজর হয় না কোলের
কোন রূপে কর দয়া এই ভুবনে
কোন রূপে কর দয়া এই ভুবনে অনন্তর অপার মহিমা তোমার কে জানে ।। তুমি রাধা তুমি কেষ্ট মন্ত্রদাতা পরম ইষ্ট মন্ত্র দাও কানে মন্ত্র দিতে সঁপে দিলে সাধুগুরু বৈষ্ণব গোঁসাইর চরণে ।। তীর্থধর্ম গয়া-কাশী বালাকুঞ্জ বানারসী মথুরা বৃন্দাবনে তীর্থে যদি গৌর পেতে ভজন-সাধন করে জীব কি কারণে ।। গুরু মুখে পদ্মবাক্য সাধু যারে করে ব্যক্ত আমি জানিনে সিরাজ সাঁই কয় অবোধ লালন শক্তি শান্ত হবে কোনদিনে ।।
কোন রসে প্রেম সেধে হরি গৌরবরণ হলো সে
কোন রসে প্রেম সেধে হরি গৌরবরণ হলো সে না জেনে সেই রসের মর্ম প্রেম-যাজন কার হয় কিসে ।। প্রভুর সে মত সেই মত সার আর যত সব যায় ছারেখার তাইতে ঘুরি কিবা করি ব্রজের পথের পাইনে দিশে ।। অনেকে কয় অনেক মতে ঐক্য হয় না মনের সাথে ব্রজের তত্ত্ব পরমার্থ ফিরি তাই জানবা আশে ।। কাম থেকে নিষ্কামী হয় আজব একটা এই জানা যায় কী মর্ম তায়
কোন রসে কোন রতির খেলা
কোন রসে কোন রতির খেলা জানতে হয় এই বেলা ।। সাড়ে তিন রতি বটে লেখা যায় শাস্ত্র পাটে সাধকের মূল তিন রস ঘটে তিনশ ষাট রসের বালা জানিলে সে রসের মর্ম রসিক তারে যায় বলা ।। তিন রস সাড়ে তিন রতি বিভাগে করে স্থিতি গুরু ঠাঁই জেনে পতি সাধন করে নিরালা তখন মানব জনম সফল হবে এড়াবে শমন জ্বালা ।। রস রতির নাই বিচক্ষণ আন্দাজি কি হয়
কী ভাব নিমাই তোর অন্তরে
কী ভাব নিমাই তোর অন্তরে মা বলিয়ে চোখের দেখা তাইতে কি তোর ধর্ম যায় রে ।। কল্পতরু হও রে যদি তবু বাপ মা গুনের নিধি এই গুরু ছাড়িয়া বিধি কে তোরে দিয়াছে হা রে ।। আগে যদি জানতে ইহা তবে কেন করলে বিয়া এখন সেই বিষ্ণুপ্রিয়া কেমনে রাখিব ঘরে ।। নদীয়া ভাবের কথা অধীন লালন জানে কি তা হা-হুতাশে শচীমাতা বলে নিমাই দেখা দে রে ।।
কী বলিস গো তোরা আজ আমারে
কী বলিস গো তোরা আজ আমারে চাঁদ গৌরাঙ্গ ভুজঙ্গ ফণী দংশিল যার হৃদ্মাঝারে ।। গৌররূপের কালে যারে দংশায় সে বিষ কি উঝাতে পায় বিষ ক্ষণেক নাই, ক্ষনেক পাওয়া যায় ধন্বন্তরী উঝা যায় ফিরে ।। ভুলব না ভুলব না বলি কটাক্ষেতে অমনি ভুলি জ্ঞানপাবন যায় সকলি ব্রহ্মমন্ত্রে ঝাড়লে না সারে ।। যদি মেলে রসিক সুজন রসিকজনার জুড়ায় জীবন বিনয় করে বলছে লালন অরসিকের কথায় দুঃখ ধরে ।।
কী দোষ দিব কারে রে
কী দোষ দিব কারে রে আপন মনের দোষে প’লাম ফেরে ।। সুবুদ্ধি সুস্বভাব গেল কাকের স্বভাব মনের হল ত্যাজিয়ে অমৃত ফল মাকাল ফলে মন মজিল রে ।। যে আশায় এই ভবে আসা ভাঙিল সে আশার বাসা ঘটিল রে দুর্দশা ঠাকুর গড়তে বানর হল রে ।। গুরুবস্তু চিনলে না মন অসময়ে কি করবি তখন বিনয় করে বলছে লালন যজ্ঞের ঘৃত কুত্তায় খেল রে ।।
কোন রাগে কোন মানুষ আছে মহারসের ধনী
কোন রাগে কোন মানুষ আছে মহারসের ধনী চন্দ্রে সুধা পদ্মে মধু যোগায় রাত্রদিনই ।। সাধক সিদ্ধি প্রবর্ত গুন তিন রাগ ধরে আছে তিনজন এই তিন ছাড়া রাগ নিরূপণ জানলে ভাবিনী ।। মৃণাল গতি রসের খেলা নব গাহট নব ঘাটেলা দশম যোগে বারি গোলা যোগেশ্বরী অযোনী ।। সিরাজ সাঁইর আদেশে লালন বলছে বাণী শোনরে এখন ঘুরতে হবে নাগরদোলন না জেনে তার মূলবানী ।।
কোণ দেশে যাবি মনা, চল দেখি যাই কোথা পির হও তুমি রে
কোণ দেশে যাবি মনা, চল দেখি যাই কোথা পির হও তুমি রে তীর্থে যাবি কি ফল পাবি সেখানে কি পাপী নাই রে ।। সঙ্গে আছে রিপু ষোলজন অহর্নিশি করে জ্বালতন যথা যাবি তথায় পাগল করতে তোরে ।। কেউ নারী ছেড়ে জঙ্গলেতে যায় স্বপ্নদোষ কি হয় না সেথায় মনের বাঘে যাহারে খায় কে ঠেকায় রে ।। ভ্রমে বারো বসে তের তাও তো সদাই শুনে ফেরো সিরাজ সাঁই কয়
কোনদিন সূর্যের অমাবস্যে
কোনদিন সূর্যের অমাবস্যে দেখি চাঁদের অমাবস্যে মাসে মাসে ।। বারো মাসে ফোটে চব্বিশ ফুল জানতে হয় কোন ফুলে তার মূল আন্দজি সাধন, কর না রে মন মূল ভুলিলে ফল পাবি কিসে ।। যে করে এই আসমানি কারবার না জানি তার কোথায় বাড়িঘর কোন সময় কখন, কর আগমন চাঁদ-চকোর মেলে কখন এসে ।। আকাশে-পাতালে শুনি দেহরতি চাহি উপাসনা উজ্জ্বল তার বাতি যদি চেতনগুরু পাই, তাহারে শুধাই লালন বলে
কোথা গেলি ও ভাই কানাই
কোথা গেলি ও ভাই কানাই সকল বন খুঁজিয়ে তোরে নাগাল পাইনে ভাই ।। বনে আজ হারিয়ে তোরে গৃহে যাব কেমন করে কী বলব মা যশোদারে ভাবনা হল তাই ।। মনের ভাব বুঝতে নারি কী ভাবের ভাব তোমারি খেলতে খেলতে দেশান্তরি ভাবে তো দেখতে পাই ।। আজ বুঝি গোচারণ খেলা খেলবি না রে নন্দলালা লালন বলে চরণ-বালা পাই না বুঝি ঠাঁই ।।
কেবল বুলি ধরেছ মারফতি
কেবল বুলি ধরেছ মারফতি তোমার বুদ্ধি নাই কো অর্ধরতি ।। মুখে মারফত প্রকাশ কর শুধালে হা করে পর খবর কিছু বলতে পার কেবল হও ছিনায় বসতি ।। চোরে যেমন চুরি করে ধরে ফেললে দোষে পড়ে মারফতি সেই প্রকারে চোরা মালের মহরতি ।। অনুমানে বুঝলাম এখন সেই জন্যেতে কর গোপন লালন বলে এসব যেমন মেয়েলোকের উপপতি ।।
কেন সময় বুঝে বাঁধাল বাঁধলে না
কেন সময় বুঝে বাঁধাল বাঁধলে না জল শুকাবে মীন পালাবে পস্তাবি রে ভাই মনা ।। ত্রিবেণীর তীর ধারে মীনরূপে সাঁই বিরাজ করে উপর উপর বেড়াও ঘুরে গভীরে কেন ডুবলি না ।। মাস অন্তে মহাযোগ হয় নীরস হতে রস ভেসে যায় করিয়ে সে যোগের নির্ণয় মীনরূপ খেলা দেখলে না ।। জগত জড়া মীন অবতার মর্ম আছে ছন্দির উপর সিরাজ সাঁই কয় লালন তোমার সন্ধানীকে চিনলে না ।।
কেন ম’লি রে মন ঝাঁপ দিয়ে তোর বাবার পুকুরে
কেন ম’লি রে মন ঝাঁপ দিয়ে তোর বাবার পুকুরে দেখি কামে চিত্ত পাগলপ্রায় তোরে ।। কেন রে মন এমন হলি যাতে জন্ম তাতেই ম’লি ঘুরলে হবে লক্ষ গলি হাতে পায়ে বেড়ি সার করে ।। দ্বীপের আলো দেখে যেমন উড়ে পড়ে পতঙ্গগণ অবশেষে হারায় জীবন আমার মন তাই করলি হা রে ।। সিরাজ সাঁই পুকারে সদাই শক্তিরূপে ত্রিজগতময় লালন ফকির বুদ্ধি হারায় আত্মতত্ব না পেয়ে সার ।।