কেন ভ্রান্ত হও রে আমার মন
কেন ভ্রান্ত হও রে আমার মন ত্রিবেণী নদীর কর অন্বেষণ ।। নদীতে বিনা মেঘে বান বরিষণ হয় বিনা বায়ে ধামাল উঠে মৌজা ভেসে যায় নদীর হিল্লোলে মরি হায় না জানি গতি কেমন ।। নদীর ক্ষণে ক্ষণে হয় রে উৎপত্তি কালিন্দে গঙ্গা নদী প্রবল বেগবতী ওরে কেউ হেলায় পার হয়ে যায় শুকনা ডেঙ্গায় কারো মরণ ।। নদীতে মাঝে মাঝে উঠছে রে ফেপি তাতে পড়লে কুটা হয় রে দুটা
কেন জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা দেখায় আসমানে
কেন জিজ্ঞাসিলে খোদার কথা দেখায় আসমানে আছেন কোথায় স্বর্গপুরে কেউ নাহি তার সন্ধান জানে ।। পৃথিবী গোল আকার শুনি আহর্নিশি ঘোরে আপনি তাইতে হয় দিন-রজনী জ্ঞানীগুনী তাই মানে ।। একদিকেতে নিশি হলে অন্যদিকে দিবা বলে আকাশ তো দেখে সকলে খোদা দেখে কয় জনে ।। আপন ঘরে কে কথা কয় না জেনে আসমানে তাকায় লালন বলে কে বা কোথায় বুঝিবে দিব্যজ্ঞানে ।।
কে বোঁঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা
কে বোঁঝে সাঁইয়ের লীলাখেলা ওসে আপনি গুরু আপনি চ্যালা ।। সপ্ততলার উপর সে নিরূপে রয় অচিন দেশে প্রকাশ্য রূপলীলারস চেনা যায় না বেদের ঘোলা ।। অঙ্গের খবর যে সৃষ্টি করিল সে পরম ইষ্টি তবে কেন আকার নাস্তি বলি না জেনে ভেদ নিরালা ।। যদি হয় কারো চক্ষুদান দেখে সেরূপ বর্তমান লালন কয় তার ধ্যান-জ্ঞান দেখি সব পুঁথিপালা ।।
কে বোঝে মওলার আলেকবাজি
কে বোঝে মওলার আলেকবাজি করছে রে কোরানের মানে যা আসে যার মনের বুঝি ।। একই কোরান পড়াশুনা কেউ মৌলবি কেউ মাওলানা দাহেরা হয় কত জনা সে মানে না শরার কাজি ।। রোজ কেয়ামত বলে সবাই কেউ বলে না তারিখ নির্ণয় হিসাব হবে কি হচ্ছে সদাই কোন কথায় মন রাখ রাজি ।। ম’লে জান ইল্লিন সিজ্জিন রয় যতদিন রোজ হিসাব না হয় কেউ বলে জান ফিরে জন্মায় তবে
কী ছার রাজত্ব করি
কী ছার রাজত্ব করি গোপাল হেন পুত্র আমার অক্রূর এসে করল চুরি ।। মিছে রাজার নামটি আছে লক্ষী সে তো গা তুলেছে যে হতে প্রাণ দিয়েছে সেই হতে অন্ধকার হেরি ।। শোকানলে চিত্ত আমার কার বা বাড়ি কার বা এ ঘর একা পুত্র গোপাল আমার করে গেল শূন্যপুরী ।। নন্দ যশোধার ছিল অক্রূর মুনি বিষম কালো প্রাপ্ত কৃষ্ণ হরে নিল লালন কয় সে দুঃখ ভারি ।।
কী ছার মানে মজে কৃষ্ণধনকে চেন না
কী ছার মানে মজে কৃষ্ণধনকে চেন না থাক থাক ওগো প্যারী দু’দিন বাদে যাবে জানা ।। কৃষ্ণরে কাঁদালে যত তুমিও কান্দিবে তত ধারণ চলন চিরদিন তো প্রচলিত আছে কিনা ।। এখন বল কোথায় হরি এনে দাও গো সহচরি তখন সে সাধিলাম প্যারী তাকি মনে লাগে না ।। বাড়াবড়ি হইলে ক্রমে কুঘটেতে আটক নয়কর্মে লালন কয় পাষান ঘামে শুনে বিন্দের বন্দনা ।।
কী কালাম পাঠালেন আমার সাঁই দয়াময়
কী কালাম পাঠালেন আমার সাঁই দয়াময় এক এক দেশে এক এক বাণী কয় খোদায় পাঠায় ।। এক যুগে পাঠায় কালাম অন্য যুগে হয় কেন হারাম এমনি দেখি ভিন্ন তামাম ভিন্ন দেখা যায় ।। যদি একই খোদার হয় রচনা তাতে ত ভিন্ন থাকে না মানুষের সকল রচনা তাইতে ভিন্ন হয় ।। এক এক দেশের এক এক বানী পাঠান কি সায৬ই গুণমণি মানুষের রচিত জানি লালন ফকির কয় ।।
কি করি ভেবে মরি মনমাঝি ঠাহর দেখিনে
কি করি ভেবে মরি মনমাঝি ঠাহর দেখিনে কত ব্রহ্মা আদি খাচ্ছে খাবি সেই ভবপারে যাই কেমনে ।। মাড়ুয়াবাদীর এমনি ধারা মাঝ দরিয়ায় ডুবায় ভারা দেশে যায় পড়িয়ে ধরা সেই দশা মোর ভাব না জেনে ।। শক্তিপদে ভক্তিহারা কপট ভাবের ভাবুক তারা আমার মন তেমনি ধারা ফাঁকে ফেরে রাত্রিদিনে ।। মাকাল ফলটি রাঙাচোঙা তায় দেখি মন হলি ঘোঙা লালন কয় তালুয়া ডোঙা কোন ঘড়ি ডুবাই তুফানে ।।
কী এক আজব কল বটে
কী এক আজব কল বটে কী ইশারায় কল টিপে দেয় অমনি ছবি ধাইয়ে উঠে ।। দেখ সে অগ্নিজল হতে সে কল পাতা ভিতরেতে ধড় ফড় করে চলছে ছবি কোন দাঁড়ায় হেঁটে ।। ধু ধু শোব্দে ধুমা ওঠে বুমা কল ফেটে একজনা তার হাতনে ফোঁকে তার জায়গায় বার পিঠে ।। দমের ঘরে রয়েছে সে আসলে কলের মূলটি গুটে লালন বলে সব অকারণ ককহন জানি যায় উঠে ।।
কী এক অচিন পাখি পুষলাম খাঁচায়
কী এক অচিন পাখি পুষলাম খাঁচায় হল না জনম ভরে তার পরিচয় ।। আঁখির কোণে পাখির বাসা দেখতে না রে কি তামাশা আমার এই আধলা দশা কে আর ঘুঁচায় ।। পাখি রাম-রহিম বুলি বলে ধরে সে অনন্ত লীলে বল তারে কে চিনিলে বল গো নিশ্চয় ।। যারে সাথে সাথে লয়ে ফিরি তারে বা কই চিনতে পারি লালন কয় অধর ধরি কীরূপ ধ্বজায় ।।
কী আজব কলের রসিক বানিয়েছে কোঠা
কী আজব কলের রসিক বানিয়েছে কোঠা শূন্য ভরে পুঁতা করে তাঁর উপরে ছাদ আঁটা ।। অনন্ত কুঠুরি থরে থর চারিদিকে আয়নামহল ঘর হাওয়ার বারাম নাই, রূপ দেখা যায় মণিমানিক্যের ছটা ।। যেদিন যাবে রসিক চাঁদ সরে হাওয়া প্রবেশ হবে না ঘরে নিভে যাবে রসের বাতি ঘুচে যাবে সব ন্যাটা ।। দেখিতে বাসনা যার হয় এল দরিয়ায় ডুবলে দেখা যায় লালন বলে মীন পালালে কারে আর দেখবা কেটা
কী আইন আনিলেন নবি সকলের শেষে
কী আইন আনিলেন নবি সকলের শেষে রেজাবন্দী সালাত যাকাত পূর্বেও তো জাহের আছে ।। ঈসা মুসা দাউদ নবী বেনামাজি নহে কভি শেরেক বেদাত সকলি ছিল নবী কি জানালো এসে ।। জব্বুর তৌরাত ইঞ্জিল কিতাব বাতিল হল কিসের অভাব নবী-পয়গম্বর কি খাস ভেবে আমি পাইনি দিশে ।। ফুরকানের দরজা ভারি কীসে হল বুঝতে নারি লালন ফকির তাই না বুঝে বিচারে গোল বাঁধিয়েছে ।।
কাশী কি মক্কায় যাবি রে মনা চল দেখি যাই
কাশী কি মক্কায় যাবি রে মনা চল দেখি যাই দোটানাতে ঘুরলে পথে সন্ধ্যাবেলায় উপায় নাই ।। মক্কা যেয়ে ধাক্কা খেয়ে যেতে চাও কাশী ধামে এমনিভাবে কাল কাটালে ঠিক নামালে কোথা ভাই ।। নৈবেদ্য পাকা কলা তা দেখে মন ভোলে ভোলা শিরনি বিলায় দরগাতলা তাও দেখে মন খলবলায় ।। চুল পেকে হল হুড়ো না পেলে পথের মুড়ো লালন বলে সন্ধি ভুলে না পেলাম কুল নদীর ঠাঁই ।।
কিবা রূপের ঝলক দিচ্ছে দ্বিদলে দেখলে নয়ন যায়রে ভুলে
কিবা রূপের ঝলক দিচ্ছে দ্বিদলে দেখলে নয়ন যায়রে ভুলে ফণি মণি সৌদামিনী যিনি ও ই রূপ উজ্বলে ।। অস্থি চর্ম মর্মজল তাতে মহারসের কল; বেগে ঢেউ খেলে তার এক বিন্দু অপার সিন্ধু হয় রে ভূমণ্ডলে ।। দেহের দল পদ্ম যার উপাসনা নাই রে তার; কথায় কি মেলে তীর্থ ব্রত যার জন্যে এই দেহে তার সব লীলে ।। রসিক যারা সচেতন রসরতি টেনে ভজন; রূপ উদয় হলে লালন
কালার কথা কেন বল আমায়
কালার কথা কেন বল আমায় যার নাম শুনিলে আগুন জ্বলে তাপিত অঙ্গ জ্বলে যায় ।। তুমি বিন্দে নামতি ধর জলে আগুন দিতে পার রাধাকে তুলাতে তোর এবার বুঝি কঠিন হয় ।। যে কৃষ্ণ রাধার অলি তারে ভুলায় চন্দ্রাবলি সে কথা আর কারে বলি ঘৃণায় আমার জীবন যায় ।। শতেক হাঁড়ির ব্যঞ্জন চাখা রাই বলে ধিক তারে দেখা লালন বলে ওহে বাঁকা সোজা হবে মনের দায় ।।
কাল কাটালি কালের বশে
কাল কাটালি কালের বশে এ তো যৌবনকাল কামে চিত্তকাল কোন কালে তোর হবে দিশে ।। যৌবনকালের কালে কামে দিলি মন দিনে দিনে হারা হলি পিতৃধন গেল নবিন জোর, আঁখি হল ঘোর কোনদিন ফিরবে রে কাল শমন এসে ।। যাদের সঙ্গে রঙ্গে রলি চিরকাল কালাকালে তারাই হল কাল মন রে জানো না, তাদের গুনপনা ধনীর ধন গেল সব রিপুর বশে ।। বাদি-ভেদী বিবাদী সবাই সাধন সিদ্ধি করতে না
কারণ নদীর জলে একটা যুগল মীন খেলছে নীরে
কারণ নদীর জলে একটা যুগল মীন খেলছে নীরে ঢেউয়ের উপর ফুল ফুটেছে তার উপর চাঁদ ঝলক মারে ।। চাঁদ-চকোর খেলে যখন একটা যুগল মীন মিলন হয় তখন তার উপর সাঁইয়ের দরশন সুধা ভাসে মৃণালতীরে ।। শুকনা জমিন জলে ভাসে আজব ধন্য লীলা গঙ্গা আসে সে নিরন্তর মীন ভাসে কুম্ভ ভাসে তীর্থ করে ।। সুধা গরল এক সহিত ঝাপা যেমন গুড়ের সঙ্গে মিঠামাখা আমি কী ফিকিরি করব ছক্কা
কার ভাবে শ্যাম নদেয় এল
কার ভাবে শ্যাম নদেয় এল ও তার ব্রজভাবের কি অসুসার ছিল ।। গোলকেরই ভাব ত্যজিয়ে সে-ভাব ব্রজপুরে প্রভু লয়েছিল যে-ভাব এবে নাহি তো সে-ভাব দেখি নতুন ভাব এভাব বুঝিতে কঠিন হল ।। সত্যযুগে সঙ্গে কৌশিক ছিল ত্রেতায় সীতা লক্ষী হল এবে দ্বাপরের সঙ্গীনী রাধা রঙ্গিণী কলির ভাবে তারা কোথায় র’ল ।। কলিযুগের ভাব একি অসম্ভব নাহি ব্রতপূজা নাহি অন্য লাভ ছিন্ন দণ্ড বেশ কেবল দণ্ড কৌমন্ডল নিতাই
কার ভাবে এ ভাব হারে জীবনকানাই
কার ভাবে এ ভাব হারে জীবনকানাই করে বাঁশি নাই মাথায় চূড়া নাই ।। ক্ষীর-সর-ননী খেতে বাঁশিটি সদাই বাজাতে কী অসুখ পেয়ে তাতে কাঙাল হলি ভাই ।। অগুরু চন্দন আদি মাখিতে নিরবধি সেই অঙ্গ ধুলায় অদ্ভুতি এখন দেখতে পাই ।। বৃন্দাবন যথার্থ বন তো বিনে হল রে এখন মানুষ লীলে করলে কোনজন লালন বলে তাই ।।
কার ভাবে এ ভাব বল রে কানাই
কার ভাবে এ ভাব বল রে কানাই রাজ-রাজ্য ছেড়ে কেন বেহাল দেখতে পাই ।। ভেবে তোর এভাব বুঝিতে নারি আজ কিসের কাঙাল আমার অটলবিহারি ছিল অগৌর-চন্দন যে অঙ্গে ভূষণ সে অঙ্গ আজ কেনে লুটায় ধুলায় ।। ব্রহ্মাণ্ড ভাবুক যারে ভাবিয়ে আজ সে ভাবুক কাহার ভাব লয়ে একি অসম্ভব ভাবনা সম্ভাবে কোন জন্য মরি মরি ভাবের বলিহারি যাই ।। অনুভাবে ভেবে কতই করি সার শ্যামচাঁদের উত্তম কি চাঁদ