ঘরে বাস করে সে ঘরের খবর নাই
ঘরে বাস করে সে ঘরের খবর নাই চার যুগে ঘর চাবি আঁটা ছোড়ান পরের ঠাঁই ।। ঘর থুয়ে ধন বাইরে খোঁজা বয় সে যেমন চিনির বোঝা পায় না রে সে চিনির মজা বলদ যেইছাই ।। কলকাঠি যার পরের হাতে তার ক্ষমতা ত্রিজগতে লেনাদেনা দিবারাতে পরে পরের ভাই ।। একি বেহাত আপন ঘরে থাকতে রতন হই দরিদ্ররে দেয় সে রতন হাতে ধরে তারে কোথা পাই ।। পর
গুরুর ভজনা কর মন ভ্রান্ত হয়ো না
গুরুর ভজনা কর মন ভ্রান্ত হয়ো না সদাই থেকো সচেতনে অচেতনে ঘুমাইও না ।। ব্যাধে যখন পাখি ধরতে যায় নয়ন তার উর্ধ্বপানে রয় এক নিরিখে চেয়ে থাকে পলক না ঘুরায় আঁখি নড়লে পাখি যাবে নয়নে পলক মের না ।। ছিদ্র কুম্ভে জল আনিতে যায় ও তাতে জল কী মতে রয় আসা-যাওয়ায় দেরী হলে পিপাসায় প্রাণ যায় মন তোর আসা যাওয়ার দিন ফুরালো গুরু-মতি ঠিক হল না ।।
গুরুর ভজনে হয় তো সতী
গুরুর ভজনে হয় তো সতী জ্যোতিরূপ নগরে যাবি কুলবতী ।। না হইলে রে সতী হবে না ভজনে মতি এক কৃষ্ণ জগতের পতি আর সব প্রকৃতি ।। প্রকৃতি হয়ে কারো প্রকৃতি ভজন তবেই হবে গোপিনীর শরণ না হলে গোপীর ভাবাশ্রয়করণ হবে না গুরুর ভজন-মতি ।। গুরুকে কর নাগরীপ্রীতি হইবে দশ ইন্দ্রিয় রিপুর মতি ফকির লালন বলে প্রেম-পিরিতি তৃতীয় ভজনে এই রীতি ।।
গুরু চরণ অমূল্য ধন বাঁধ ভক্তিরসে
গুরু চরণ অমূল্য ধন বাঁধ ভক্তিরসে মানব জনম সফল হবে গুরু উপদেশ ।। হিংসা নিন্দা তমঃ ছাড় মরার আগেতে মর তবে যাবে ভবপার ঘুচবে মনের বেদিশে।। ষোলকলা পূর্ণরতি হতে হবে ভাবপ্রকৃতি গুরু দিবে পূর্ণরতি হৃদ-কমলে বসে ।। পারাপারের খবর জানো মহর গুরুকে মানো লালন কয় ভাবছ কেন পড়ে মায়ার ফাঁসে ।।
গুরুরূপের পুলক দিচ্ছে ঝলক যার অন্তরে
গুরুরূপের পুলক দিচ্ছে ঝলক যার অন্তরে কিসের একটা ভজন সাধন লোক জানাতে করে ।। বকের ধরণ করণ তার তো নয় দিকছাড়া রূপ নিরিখ সদাই পলক ভরে ভবপারে যায় সেই নিরিখ ধরে ।। জ্যান্তে গুরু না পেলে হেথা ম’লে পাব সে কথার কথা সাধক জনে বর্তমানে দেখে ভজে তারে ।। গুরুভক্তির তুলনা দেব কী যে ভক্তিতে সাঁই থাকে রাজি লালন বলে গুরুরূপে নিরূপ মানুষ ফেরে ।।
গুরু বিনে সন্ধান কে জানে
গুরু বিনে সন্ধান কে জানে সে ভেদ জাহের নয় তা বাতেনে ।। সুধার কথা লোকে বলছে সুধা আছে গুরুর কাছে জানগে উদ্দিশে সুধানিধি দেখতে পাবি ভক্তি দাও ঐচরণে ।। বারো মাসে তের তিথি সে সে চাঁদ নাই অমাবস্যে ভজনে স্থিতি সে মাসে মাসে জোয়ার আসে চন্দ্র উদয় সেইখানে।। রুহিনীর চাঁদ কপালেতে রয় নীলপদ্মে কৃষ্ণের আসন বসে সেবা নেয় লালন ভণে ভরা গাঙ্গে আত্মতত্ব নাই মনে ।।
গুরু দেখায় গৌর তাই দেখি কি গুরু দেখি
গুরু দেখায় গৌর তাই দেখি কি গুরু দেখি গৌর দেখতে গুরু হারাই কোনরূপে দিই আঁখি ।। গুর গৌর রইল দুই ঠাঁই কীরূপে একরূপ করি তাই এক নিরুপন না হইলে মন সকলই হবে ফাঁকি ।। প্রবর্তের নাই কোন ঠিকানা আন্দাজে কি হয় সাধনা মিছে সদাই সাধুর হাটায় নাম পাড়ালাম সাধ কি ।। একরাজ্যে দুইজন রাজা কারে বা কর দেবে প্রজা লালন প’লো তেমনই গোলে খাতায় প’লো বাকি ।।
গুরু দয়া যারে করে সে-ই জানে
গুরু দয়া যারে করে সে-ই জানে কীরূপে সাঁই বিরাজ করে দেহভুবনে ।। শহরে সহস্র পাড়া তিনটি পথ তার এক মহড়া আলেক সোয়ার পবন-ঘোড়া ফিরছে সেইখানে।। জলের বিম্ব আলের উপর অখন্ড প্রলয়ের মাঝার যার বিন্দুতে হয় সিন্ধু তাঁহার ধারা বয় ত্রিগুনে।। হাতের কাছে আলেক শহর রঙ বেরঙয়ের উঠছে লহর সিরাজ সাঁই কয় লালনরে তোর সদাই ঘোর মনে ।।
গুরু গো মন ভ্রান্তি যায় না সংসারে
গুরু গো মন ভ্রান্তি যায় না সংসারে মন ভ্রান্ত কর শান্ত শান্ত হয়ে রই ঘরে ।। একটি কথার আনকা শুনি পিতা পুত্রে এক রমণী কোনখানে রেখেছে ধনি বল দেহের মাঝারে ।। আহার নাই সে উপবাসী নিত্য করে একাদশী প্রভাতে হয় পূর্ণশশী পূর্নিমার চাঁদ অন্ধকারে ।। ছেষট্টি দিনে এক ছেলে হল সেই ছলে বাজারে গেল লালন মহা গোলে প’লো ফিরছে রে জীবের দ্বারে ।।
গৌরপ্রেম করবি যদি ও নাগরী
গৌরপ্রেম করবি যদি ও নাগরী কুলের গৌরব আর করনা কুলের লোভে মান বাড়াবি কুল হারাবি গৌরচাঁদ দেখা দেবে না ।। ফুল ছিটাও বনে বনে মনে মনে বনমালীর ভাব জান না চৌদ্দ বৎসর বনে বনে রামের সনে সীতা লক্ষণ এই তিনজনা ।। যতসব টাকাকড়ি এ ঘর বাড়ি কিছুই তো সঙ্গে যাবে না কেবল পাঁচ কড়াকড়ি কলসিদড়ি কাঠখড়ি আর চটবিছানা ।। গৌরের সঙ্গে যাবি দাসী হবি এইটা মনে কর
গৌরপ্রেম অথাই ঝাঁপ দিয়েছি তাই
গৌরপ্রেম অথাই ঝাঁপ দিয়েছি তাই এখন আমার প্রণে বাঁচা ভার করি কী উপায় ।। একেতো সে প্রেমনদীর জলে থাই মেলে না নোঙর ফেলে বেহুঁশেতে নাইতে গেলে জলে কাম-কুম্ভীরে ধরে খায় ।। ইন্দ্রবারি শাসিত করে জোয়ার-ভাটায় বাইতে পারে সে ভাব আমার নাই অন্তরে কোনটা সাধি কোনটা হয় ।। গৌরপ্রেমের এমনি ন্যাটা আসতে জোয়ার যেতে ভাটা না বুঝে মুড়ালাম মাথা লালন ভেবে কয় ।।
গৌর আমার কলির আচার-বিচার কী আইন আনিলে
গৌর আমার কলির আচার-বিচার কী আইন আনিলে কী ভাবে বিয়োগী হইয়া বৈরাগী গৌর কুলের আচার বিচার সব ত্যেজিলে ।। হরি বলে গৌর রাইপ্রেমে আকুল হয় নয়নের জলে বদন ভেসে যায় দেখে উহার দশা সবাই জ্ঞান নৈরাশা আপনি কেঁদে এ জগত কাঁদালে ।। এ ভাব জীবের সম্ভব নয় দেখে লাগে ভয় চন্ডালেরে প্রভু আলিঙ্গন দেয় নাই জাতের বোল বলে হরিবোল বেদ-পুরানাদি সব ছাড়িলে ।। গৌর সিংহের হুংকার ছাড়ানে
গোষ্ঠে চল হরি মুরারি
গোষ্ঠে চল হরি মুরারি লয়ে গো ধন গোষ্ঠের কানন চল গোকুলবিহারী ।। তুই আমাদের সঙ্গে যাবি বনফল সব খেতে পাবি আমরা ম’লে তুই বাঁচাবি তাই তোরে সাঙ্গ করি ।। ওরে ও ভাই কেলে সোনা চরণে নূপুর নে না মাথায় মোহনচূড়া দে না ধড়া পর বংশীধারী ।। যে ত্বরাবে ঐ ত্রিভুবন সেই যাবে আজ গোষ্ঠের কানন ঠিক রেখ মন অভয়চরণ লালন ঐ চরণের ভিখারী ।।
গোল করনা গোল করনা ওগো নাগরী
গোল করনা গোল করনা ওগো নাগরী দেখ দেখি ঠাওরে দেখি কেমন গোরা ঐ হরি ।। সাধু কি ও যাদুকরি এসেছে এই নদেপুরি খাটবে না হেথায় জারিজুরি তাই ভেবে মরি ।। বেদ-পুরাণে কয় সমাচার কলিতে আর নাই অবতার যে কয় সেই গিরিধর এসেছে নদেপুরি ।। বেদে যা নাই তাই যদি হয় পুথি পড়ে কেন মরতে যায় লালন বলে ভজবো সদাই ঐ গৌরহরি ।।
গোয়াল ভরা পুষণে ছেলে বাবা বলে ডাকে না
গোয়াল ভরা পুষণে ছেলে বাবা বলে ডাকে না মনের দুঃখ মন জানে সে অন্যে তা জানে না ।। মন আর তুমি মানুষ দুইজন এই দুজনাতেই প্রেমালাপন কখন সুধার বরিষণ কখন গরল খেয়ে যন্ত্রণা ।। মন আর তুমি একজন হলে অনায়াসে অমূল্য ধন মেলে একজনাতে আর একজন এলে হয় মুর্শিদরূপ প্রকাশনা ।। পাবার আশে অমূল্য ধন জীবন যৌবন সব সমর্পন আশাসিন্ধুর কুলে লালন আপন কিছু রাখল না ।।
গোপালকে আজ মারলি গো মা কোন পরাণে
গোপালকে আজ মারলি গো মা কোন পরাণে সেকি সামান্য ছেলে তাই ভাবলি মনে ।। দেবের দুর্লভ গোপাল চিনে না যার ফেরের কপাল যে চরণ আশায় শ্মাশানবাসী হয় দেবাদিদেব শিব পঞ্চাননে ।। একদিন যার ধেনু হরে নিল ব্রহ্মা পাতালপুরে তাইতে ব্রহ্মা দোষী হয় সবাই জানতে পায় তুমি জানো না এই বৃন্দাবনে ।। যোগেন্দ্র মহেন্দ্র আদি যোগ সেধে না পায় নিধি সেহি কৃষ্ণ ধন তোমার পালন ফকির লালন বলে
গোঁসাইয়ের ভাব যেহি ধারা
গোঁসাইয়ের ভাব যেহি ধারা আছে সাধুশাস্ত্রে যার প্রমাণ ধারা শুনলে জীবের কর্ম সারা ।। যেজন মরার সঙ্গে মরে ভাবের সাগরে ডূবতে যদি পারে সুরসিক তারা ।। দুগ্ধে বারিতে মিশাল সদা মন্থন দন্ডে করে আলাদা আলাদা তেমনি ভাবের ভাবে সুধানিধি পাবে মুখের কথায় হয় না সে ভাব ধরা ।। অগ্নি যেমন ঢাকা ভষ্মের ভেতরে সুধা তেমনি আছে গরলের ভেতরে কেউ সুধার লোভে যেয়ে মরে গরল খেয়ে মন্থনের ভাব
গড়-মুসুল্লি বলছ কারে
গড়-মুসুল্লি বলছ কারে মুসুল্লি সব এ সংসারে ।। শুনবো সাঁইয়ের নিগুম কথা আশা-তসবির জন্ম কোথা কোথায় পেল গলার খিলকা মাথায় তাজ পরালো কে রে ।। একটি মরার পাঁচটি কল্লা কল্লায় কল্লায় বলছে আল্লা কোন কল্লায় হয় রসুলউল্লা সর্বদা নাম জপিল রে রে ।। তহবন পড়ে হলি খাঁটি উপরে ডোর নিচে নেংটি লালন বলে এসব ফষ্টি খাটবে না রে সাধুর দ্বারে ।।
গরল ছাড়া মানুষ আছে কে রে
গরল ছাড়া মানুষ আছে কে রে সেই মানুষ জগতের গোড়া আলা-কুল্লে জাহির আছে রে ।। লা-মোকামে আছে বারি জবরুতে হয় তার ফুকারি জাহের নয় সে রই গভীরি জিহবাতে কে সে নাম করে ।। তিন আলেফে দিয়ে জবর হবে সেই মানুষের খবর করণ চৌদ্দ ভুবন উপর সে কথা ব্যক্ত আছে যে রে ।। সেই মানুষ কর সাথী কাদের মওলাকে চিনবা যদি লালন খোঁজে জন্মাবধি মানুষ লুকায় পলকে রে
খেয়েছি বেজেতে কচু না বুঝে
খেয়েছি বেজেতে কচু না বুঝে এখন তেঁতুল কোথা পাই না খুঁজে ।। কচুর এমন মান গোঁসাই তারে কেউ চিনল না ভাই খেয়ে হলাম পাগল পারা এখন চুপনি ঘোড়া চুলকাইছে ।। ভেবে নিমবৃক্ষ তার তাতে দিয়ে চিনির সার কখনো সে হয় না মিঠে এমনি কচুর বংশ সে ।। যত সব ভড়ুয়া বাঙ্গালে কচুকে মান গোঁসাই বলে লালন ভেড়ো দেখ না পড়ে ঐ কথায় কি মন মজে ।।